ভাই ও বোনেরা, প্রথমে স্মরণ করি আমার বাংলাদেশের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী, সিপাহী পুলিশ, জনগণকে, হিন্দু মুসলামকে; যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে এবং তাদের পরিবারের প্রতি দুঃখ নিবেদন করে আমি আপনাদের কাছে দুই এক কথা বলতে চাই।
আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের স্বাদ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমি আজ বক্তৃতা করতে পারব না। বাংলার ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী যেভাবে সংগ্রাম করেছে; আমি কারাগার বন্দী ছিলাম, ফাঁসি কাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম আমার বাঙালিকে কেউ দাবায়া রাখতে পারবে না, আমার বাংলার মানুষ হারবে না।
প্রায় ত্রিশ লক্ষ লোককে মেরে ফেলা হয়েছে বাংলায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে এবং প্রথম মহাযুদ্ধেও এতো লোক, এতো সাধারন নাগরিক মৃত্যুবরণ করে নাই, শহীদ হয় নাই যা আমার এই প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশে হয়েছে। আমি জানতাম না আপনাদের কাছে আমি ফিরে আসব। সেখানে একটা কথাই বলেছিলাম,
“তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও আমার আপত্তি নাই কিন্তু মৃত্যুর পরে আমার লাশটা আমার বাঙালীর কাছে ফিরিয়ে দিও। এই একটা অনুরোধ তোমাদের কাছে রইলো।”
তবে মনে রাখা উচিৎ বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশ স্বাধীন থাকবে, বাংলাদেশকে কেউ দমাতে পারবে না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,
“সাতকোটি বাঙালিরে হে বঙ্গ জননী,
রেখেছ বাঙালি করে মানুষ কর নি।”
কবিগুরুর কথা মিথ্যা প্রমাণ হয়ে গেছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।
জানতাম আমার ফাঁসির হুকুম হয়েছে, আমার জেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছে। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম। বলেছিলাম,
“আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলাম। একবার মরে, দুইবার মরে না।”
আমি বলেছিলাম,
“আমার মৃত্যু লিখা থাকে যদি আমি হাসতে হাসতে যাব। আমার বাঙালি জাতিকে অপমাণ করে যাব না, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না। যাবার সময় বলে যাব, জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।”
আজ থেকে আমার অনুরোধ, আজ থেকে আমার আদেশ, আজ থেকে আমার হুকুম ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, আমি তোমাদের ভাই, তোমরা আমার ভাই, এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি আমার বাংলার মা বোনেরা ইজ্জত ও কাপড় না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের মানুষ, যারা আমার যুবক শ্রেণী আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।
যথেষ্ট কাজ পড়ে আছে। আপনারা জানেন, আমি সমস্ত জনগণকে চাই। যেখানে রাস্তা ভেঙ্গে গেছে, নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দাও। আমি চাই জমিতে যাও, ধান বোনাও। কর্মচারীদের বলে দেবার চাই, একজনও ঘুষ খাবেন না, আমি ক্ষমা করবো না।
যারা জানতে চান আমি বলে দেবার চাই, আসার সময় দিল্লীতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আমার আলোচনা হয়েছে। আমি আপনাদের বলতে পারি, আমি জানি তাঁকে। তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি। যেদিন আমি বলবো সেই দিনই ভারতের সৈন্য বাংলার মাটি ছেড়ে চলে যাবে।
আজ আমার কারও বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নাই, একটা মানুষকে তোমরা কিছু বলো না, অন্যায় যে করেছে তাকে সাজা দিব। আইনশৃঙ্খলা তোমাদের হাতে নিও না। আমি দেখায়া দেবার চাই দুনিয়ার কাছে শান্তিপূর্ণ বাঙ্গালি রক্ত দিতে জানে, শান্তিপূর্ণ বাঙ্গালি শান্তি বজায় রাখতেও জানে।
এই বাংলাদেশে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা, এই বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র, এই বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।
