বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে মব ভায়োলেন্স বা দলবদ্ধ সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। পিটিয়ে হত্যা, হামলা ও নিপীড়নের ঘটনা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বলে জানিয়েছে দেশের একাধিক মানবাধিকার সংগঠন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগেই এই সহিংসতা বাড়ছে।
২০২৫ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি জানিয়েছে, বছরজুড়ে ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মাজার–দরগা ও বাউলদের ওপর একের পর এক মব হামলার ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের উপস্থিতিতেও হামলা থামানো যায়নি।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মব ভায়োলেন্স একটি “প্রকট ও প্রাণঘাতী ট্রেন্ড” হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসে নিহত হন ১২৬ জন, আর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬০ জনে তিনগুণেরও বেশি।
সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী আইনজীবী সাইদুর রহমান বলেন, “মব ভায়োলেন্স থামাতে সরকারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। তারা চায় না বলেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকেই অনেক সময় উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা যায়।”
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ঢাকাসহ আট বিভাগে মব সহিংসতায় অন্তত ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন, যেখানে ২০২৪ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ১২৮। সংস্থাটি মনে করছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও মানবাধিকার পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি; বরং পুরোনো নিপীড়ন নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ১৬৮ জন নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা এবং সরকারের দুর্বল অবস্থান মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে মবকে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে বর্ণনা করার বক্তব্যও পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে বলে অভিযোগ।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার মাজারে হামলার সময় পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও হামলা ঠেকাতে না পারার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে কেউ কেউ মব উস্কানিদাতাদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে জানতে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও পুলিশ মহাপরিদর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের সহকারী মহাপরিদর্শক এনামুল হক সাগর বলেন,“মব সন্ত্রাসের প্রতিটি ঘটনাকে পুলিশ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ও তাৎক্ষণিক জনরোষ অনেক সময় পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়, তবে মব সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি দাবি করেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত টহল, বিট পুলিশিং, দ্রুত রেসপন্স টিম ও সাইবার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বক্তব্য নয় মব ভায়োলেন্স ঠেকাতে এখনই কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
