প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। শনিবার সেই একই স্থানে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদিকে দাফন করা হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একই সঙ্গে নজরুল পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রকাশ করা হয়েছে তীব্র প্রতিবাদ ও উদ্বেগ।
নজরুলের জন্মস্থান ভারতের পশ্চিম বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় কবির পরিবারের সদস্যরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই সিদ্ধান্তের পর জাতীয় কবির সমাধির নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে না তো।
ভারতের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা নজরুল পরিবারের সদস্যদের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে কবি পরিবারের উদ্বেগ ও আপত্তির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে শুক্রবার গভীর রাতে এক জরুরি বৈঠকের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নজরুলের সমাধির পাশেই ওসমান হাদিকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত জানায়। শনিবার দুপুরে জানাজা শেষে বিকেলে তাকে সেখানে দাফন করা হয়।
দাফন কার্যক্রম শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান সাংবাদিকদের বলেন, “শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন। দেশের জন্য তার যে ত্যাগ, আল্লাহ তা’আলা কবুল করুন।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশাপাশি একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রথিতযশা শিক্ষকের সমাধি রয়েছে। তবে নজরুলের সমাধির এত কাছাকাছি একজন রাজনৈতিক কর্মীকে সমাহিত করা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মহল ও সামাজিক পরিসরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
নজরুল পরিবারের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
কবির পরিবারের সদস্য সোনালি কাজী ও স্বরূপ কাজী বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ওই স্থানে কেবল নির্দিষ্ট কয়েকজনকেই সমাহিত করা হয়। অথচ পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্ত্বেও নজরুলের সমাধির পাশে ওসমান হাদিকে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা অনৈতিক এবং প্রশ্নবিদ্ধ।
সোনালি কাজী বলেন, “আমাদের প্রাণের কবি বাংলাদেশে তার জীবনের শেষ সময় কাটিয়েছেন। এতদিন আমরা সেখানে নিরাপদ ও সম্মানিত ছিলাম। কিন্তু এখন যা হচ্ছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, “যে দেশে ছায়ানটে হামলা হয়, রবীন্দ্রনাথের বই পোড়ানো হয় সেই উগ্রবাদীদের একজনকে নজরুলের সমাধির পাশে দাফন করা হলো। নজরুল তো সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তা দিয়ে গেছেন। তাহলে সরকারের নির্দেশে এমন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো?”
নজরুলের সমাধির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। বলেন, “আগামী দিনে কবির সমাধি সেখানে থাকবে কিনা—এই প্রশ্ন এখন আমাদের ভাবাচ্ছে।”
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মতো মনীষীদের উত্তরাধিকার যেন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষুণ্ন না হয়। নজরুলকে অসম্মান করা হলে তা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো জাতির জন্যই অপমানজনক হবে।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনে গণসংযোগে অংশ নিতে গিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার তিনি মারা যান।
