‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই’ বিজয়ের গানের সেই পঙ্ক্তি এবারও শোনা গেল না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের বিজয় দিবসের রাষ্ট্রীয় আয়োজনে বদলে গেছে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম যেমন অনুপস্থিত, তেমনি নেই পাকিস্তানি বাহিনীর কথাও।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বিজয় দিবসের বাণীতে ১৯৭১-এর বিজয়ের কথা থাকলেও নেই কীভাবে, কার নেতৃত্বে এবং কার বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল তার উল্লেখ। শহীদের সংখ্যা কিংবা বীরাঙ্গনাদের কথাও বাণীতে আসেনি।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও বাঙালির শোষণ-বঞ্চনা থামেনি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির প্রধান কণ্ঠে পরিণত হন। ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর আসে বিজয়। সেই ইতিহাসই ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্মৃতির কেন্দ্রে।
কিন্তু ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান এবং নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সেই কেন্দ্র বদলাতে শুরু করে। আওয়ামী লীগ দাবি করছে, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনের’ অবসান ঘটানোর নামে সরকার পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবন্ধুর নাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মুছে দিচ্ছে।
বিজয় দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগের বিবৃতিতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ সংকটে, পুরনো পরাজিত শক্তি আবার সক্রিয়। শেখ হাসিনা তার বাণীতে অভিযোগ করেন, ক্ষমতা পরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচিহ্নে হামলা, ভাস্কর্য ভাঙচুর, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা চলছে এবং দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীরা মুক্তি পাচ্ছে।
অন্যদিকে, অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা যুক্তি দিচ্ছেন, বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করেই শেখ হাসিনা একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করেছিলেন। বাকশাল প্রসঙ্গ টেনে তারা বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় স্মরণ তালিকা থেকে সরানোর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
এ প্রেক্ষাপটে বিএনপিও পুরনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিজয় দিবসের বাণীতে আবারও দাবি করেন, ২৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল যা অতীতে আদালতের নির্দেশনা ও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
রাষ্ট্রীয় আয়োজনে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি তাই শুধু একটি নাম বাদ পড়া নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, নেতৃত্ব এবং উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পালাবদলের এই সময়ে প্রশ্নটা তাই আরও তীব্র বাংলাদেশ কোন ইতিহাসকে রাষ্ট্রীয় স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে?
