নিজস্ব প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশি তরুণদের পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠনগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়া এখন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে নতুন উদ্বেগের নাম। বিশেষ করে পাকিস্তানের তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান–টিটিপি–এ যোগ দিতে বাংলাদেশ থেকে তরুণদের যাত্রা বেড়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
টিটিপির হয়ে লড়াই করতে গিয়ে নিহতদের একজন ফয়সাল হোসেন। মাদারীপুরের ২২ বছর বয়সী ফয়সাল কাজের সন্ধানে দুবাই যাচ্ছে বলে পরিবারকে জানিয়ে দেশ ছাড়লেও শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে মারা যান। তার ভাই আরমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতেই তাকে শনাক্ত করেন।
পাকিস্তান আরও জানিয়েছে, ফয়সালের মতো অন্তত আরও চার বাংলাদেশি সম্প্রতি টিটিপির হয়ে যুদ্ধে মারা গেছে। এই তরঙ্গকে তারা “ফিতনা আল-খাওয়ারিজ” নামে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট বলছে, অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন বাংলাদেশি বর্তমানে পাকিস্তানে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের হয়ে যুদ্ধ করছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলেই জোবায়ের আহমেদ নামে আরেক বাংলাদেশি পাকিস্তানে নিহত হন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার মা আলেয়া আক্তারের কাছে বিদেশ থেকে ফোন করে তার মৃত্যুর খবর দেয় অজ্ঞাত কেউ।
এই তরুণদের প্রেক্ষাপট প্রায় একই। নিম্ন বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার, সীমিত শিক্ষা, বিদেশে কাজের স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নকেই ব্যবহার করে তাদের টেনে নেওয়া।
ফয়সাল ও রতন ঢাকায় রফ রফ নামে একটি হিজামা সেন্টারে কাজ করতেন। পরিবারকে দুবাইয়ের চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে আসলে তারা ভারতে প্রবেশ করে, তারপর সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পাকিস্তানে চলে যায়। তদন্তে উঠে এসেছে তারা বেনাপোল দিয়ে ভারতে যায়, কলকাতা ও দিল্লিতে কিছুদিন অবস্থান করে, এরপর অবৈধ পথে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তানে পৌঁছায়।
জোবায়েরের পথটি আলাদা। তিনি উমরাহ করতে সৌদি আরব গিয়ে আর দেশে ফেরেননি। সেখান থেকে বৈধ পথেই পাকিস্তানে যান বলে জানিয়েছে সিটিটিসি।
ফয়সাল, রতন, জোবায়ের তাদের পরিবারের দাবি একই। সন্তানদের প্রতারণা করে জঙ্গিবাদের পথে নেওয়া হয়েছে। পরিবারগুলো দোষীদের শাস্তি দাবি করছে।
সিটিটিসির মতে, টিটিপি ছাড়াও টিএলপি ও আইএমপি’র মতো পাকিস্তানি চরমপন্থি সংগঠনে বাংলাদেশিদের যোগ দেওয়ার ঘটনা তারা চিহ্নিত করেছে। বেশিরভাগ নিয়োগ অনলাইনেই হয় ধর্মীয় বক্তব্যের অপব্যাখ্যা, বিভ্রান্তি, আর দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ দেখিয়ে।
দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুবাশার হাসান বলছেন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোই সবচেয়ে ঝুঁকিতে, কারণ খুব অল্প প্রতিশ্রুতিতেই তাদের আকৃষ্ট করা যায়।
অন্যদিকে টিটিপির মুখপাত্র ইমরান হায়দারের দাবি, কেউ জোর করে যোগ দেয়নি। সবাই “ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে” এসেছে। তিনি নিজেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক প্রকৌশলী হিসেবেও দাবি করেছেন।
বাংলাদেশি তরুণদের পাকিস্তানে গিয়ে লড়াইয়ে অংশ নেওয়া এটি দক্ষিণ এশিয়ার জঙ্গিবাদের নতুন এক রূপ, বলছেন গবেষকরা। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর অবস্থান থাকলেও অনলাইনে সক্রিয় আন্তর্জাতিক চক্রগুলো তরুণদের টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সিটিটিসি বলছে, অন্তত ১০০ জনকে তারা বিদেশে যাওয়ার আগেই থামাতে পেরেছে।
তবে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেওয়ার এই প্রবণতা কেন বাড়ছে এ প্রশ্ন এখন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
