নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পূর্বাচলের ছয়টি প্লট সংক্রান্ত মামলায় শেখ হাসিনার পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল। মামলায় শেখ হাসিনার ভাগ্নি ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের নাম সরাসরি না থাকলেও বাংলাদেশি আদালত তাকে দণ্ডিত করেছেন।
আদালত উল্লেখ করেছে, টিউলিপ সিদ্দিক তার মা শেখ রেহানার নামে রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে একটি প্লট বরাদ্দে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেছেন।
গার্ডিয়ানকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় টিউলিপ সিদ্দিক বলেন, ‘ত্রুটিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক’ প্রক্রিয়ায় তার অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশে বিচার সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “এই পুরো প্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের’ ফলাফল যেমন অনুমানযোগ্য ছিল, তেমনি এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।”
টিউলিপের বক্তব্য, “আশা করছি এই তথাকথিত ‘রায়’ যথাযোগ্য অবজ্ঞার সঙ্গেই বিবেচিত হবে। আমার মনোযোগ সবসময়ই আমার নির্বাচনী এলাকা হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেটে। বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতির মাধ্যমে আমি বিভ্রান্ত হতে চাই না।”
ঢাকার চতুর্থ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক রবিউল আলম সোমবার রায়ে টিউলিপকে দুই বছরের কারাদণ্ড, তার মা শেখ রেহানাকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং খালা, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন।
মামলার অভিযোগ ছিল, ঢাকা শহরে বাড়ি বা ফ্ল্যাট থাকা সত্ত্বেও শেখ রেহানা তথ্য গোপন করে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠার একটি প্লট নেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বোনকে সহায়তা করেছেন। আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে, টিউলিপ সিদ্দিক তার মা রেহানাকে প্লট পাওয়াতে খালাকে প্রভাবিত করেছেন।
টিউলিপ শুরু থেকেই বলেছেন, তার বিরুদ্ধে এসব ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। শেখ রেহানা প্রথমে তার সঙ্গে যান, পরে যুক্তরাজ্যে চলে যান। মামলার বিচার চলাকালীন তাদের কোনো আইনজীবী অংশ নিতে পারেননি।
যুক্তরাজ্যের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী সম্প্রতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে চিঠি দিয়ে প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, টিউলিপ সিদ্দিক এই মামলা লড়ার “ন্যূনতম অধিকারও পাননি” এবং অভিযোগ সম্পর্কে ধারণা বা আইনজীবীর নিয়োগের সুযোগও পাননি।
সোমবার রায়ে বিচারক রবিউল আলম বলেন, “বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় পৃথিবীর যেখানে অবস্থান করুক না কেন সেই আসামিকে বিচার করতে আইনে কোনো বাধা নেই। কেবলমাত্র মৃত্যুদণ্ডের ধারার মামলার ক্ষেত্রে পলাতক আসামির জন্য রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের বিধান রয়েছে। এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডের অভিযোগ না থাকায় ডিফেন্স ল ইয়ার প্রদানের সুযোগ নেই।”
দুদকের মামলা প্রসঙ্গে টিউলিপের আইনজীবী অভিযোগ করেন, দুদক ‘প্রামাণিক নথি’ ছাড়া তার বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়েছে এবং যোগাযোগ চেষ্টাতেও সাড়া দেয়নি। এ কারণে তার ‘ন্যায়বিচারের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত’ হয়েছে।
দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেছিলেন, টিউলিপ নির্দোষ হলে কেন তিনি পদত্যাগ করেছেন। “কেন তিনি তার আইনজীবীদের দুদকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন? দুদক তার আইনজীবীকে ইমেইলের মাধ্যমে অনুরোধ জানিয়েছে, যেন বাংলাদেশে এই মামলার আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন।”
গত বছরের মাঝামাঝিতে লেবার পার্টির নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে সরকার গঠন হয় এবং টানা চারবারের এমপি টিউলিপ সিদ্দিক আর্থিক সেবা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা ও শফিক সিদ্দিকীর মেয়ে টিউলিপ প্রথমবার এমপি হন ২০১৫ সালে। এরপর ২০১৭ এবং ২০১৯ সালে পুনঃনির্বাচিত হন। লন্ডনের মিচামে জন্মগ্রহণ করা টিউলিপের শৈশব বাংলাদেশ, ভারত ও সিঙ্গাপুরে কেটেছে। তিনি লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে পলিটিক্স, পলিসি ও গভর্মেন্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
