ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত জালিয়াতির মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন যুক্তরাজ্যের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী। তারা যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে চিঠি পাঠিয়ে এ মামলা সাজানো এবং অন্যায্য বলে মন্তব্য করেছেন।
আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ব্রিটিশ বিচার মন্ত্রী রবার্ট বাকল্যান্ড। এছাড়া টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী শেরি ব্লেয়ার, ডমিনিক গ্রিভ, ফিলিপ স্যান্ডস ও জিওফ্রি রবার্টসনও আছেন বলে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে তারা বলেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক এই মামলায় ন্যূনতম অধিকারও পাননি। অভিযোগ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা বা আইনজীবী রাখার সুযোগ কিছুই তাকে দেওয়া হয়নি।
লেবার এমপি টিউলিপ বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি। গত সপ্তাহে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ অভিযোগে তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যেটিকে তিনি সাজানো আদালতের প্রতিহিংসামূলক রায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও রায় ও বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর আদালত প্লট জালিয়াতির চার মামলার রায় ঘোষণার তারিখ জানিয়েছে। এসব মামলার একটিতে শেখ রেহানা ও তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক আসামি। দুদকের দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণার তারিখ ১ ডিসেম্বর। হাসিনা, রেহানা ও টিউলিপকে ‘পলাতক’ দেখিয়েই বিচার এগিয়ে নেওয়া হয় এবং এতে তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবীও আদালতে দাঁড়াতে পারেননি। দুদক এ মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চেয়েছে।
টিউলিপ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন। তার ঘনিষ্ঠ একজন জানান, এটি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার মামলা। তার ভাষায়, টিউলিপের নিজের দলের বাইরের খ্যাতিমান রাজনীতিবিদরাও এই অসঙ্গতিপূর্ণ বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি ড. ইউনূসের জন্যও লজ্জাজনক।
চিঠিতে ব্রিটিশ আইনজীবীরা দাবি করেন, বাংলাদেশে টিউলিপ যে আইনজীবীকে নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন, তাকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে, গৃহবন্দি রাখা হয়েছে এবং তার মেয়েকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। তারা লিখেছেন, এই বিচার প্রক্রিয়া সাজানো এবং অন্যায্যভাবে মামলা পরিচালনার উদাহরণ।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, টিউলিপ তার খালা শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করে ঢাকার পূর্বাচলে তার মা শেখ রেহানার জন্য প্লট বরাদ্দ করাতে সহায়তা করেছিলেন। টিউলিপ অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছেন।
আইনজীবীরা চিঠিতে আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আইনের শাসন নিয়ে কথা বললেও টিউলিপের মামলায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা তাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। তাদের মতে, টিউলিপ যুক্তরাজ্যের নাগরিক এবং পলাতক নন। তার বিরুদ্ধে যথাযথ অভিযোগ থাকলে তাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করা সম্ভব। কিন্তু তাকে অভিযোগপত্র, প্রমাণ বা আইনজীবীর সুযোগ কোনোটিই দেওয়া হয়নি।
চিঠিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের সঙ্গে এই ঘটনা পুরোপুরি মিলে যায়। মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তারা টিউলিপকে নিয়ে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক মন্তব্য করছেন। অধ্যাপক ইউনূসও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করছেন, যা নিরপেক্ষ বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
আইনজীবীরা লিখেছেন, টিউলিপের অনুপস্থিতিতে চলমান বিচার অন্যায্য এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মানা হচ্ছে না। সব সমস্যার সমাধান করে ন্যায়সঙ্গত বিচার নিশ্চিত করতে তারা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর রূপপুর প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে টিউলিপের নাম আসার পর বিষয়টি নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। এরপর টিউলিপ ও তার পরিবারের ‘উপহারের’ ফ্ল্যাট নিয়েও সমালোচনা ছড়ায়।
এ নিয়ে বিতর্ক বাড়লে গত জানুয়ারিতে তিনি সিটি মিনিস্টারের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে প্রশংসা করেছিলেন। পরে ব্রিটিশ নৈতিকতা উপদেষ্টা স্যার লরি ম্যাগনাস তদন্ত শেষে তাকে অভিযোগমুক্ত ঘোষণা করেন, যদিও তিনি উল্লেখ করেন টিউলিপ যদি পরিবারের রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আরও সতর্ক হতেন তবে তা তার জন্য ভালো হতো।
