বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ধাপে ধাপে চলে যাচ্ছে বিদেশি কোম্পানির হাতে। বন্দরের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের মধ্যে পাঁচটির নিয়ন্ত্রণই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটির চুক্তি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে এবং চরম গোপনীয়তায় তড়িঘড়ি করে সম্পাদিত এসব দীর্ঘমেয়াদি লিজ চুক্তিকে ‘আত্মঘাতী’ ও ‘অস্বচ্ছ’ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী, শ্রমিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলো।
তড়িঘড়ি করে ইজারা ও গোপনীয়তা অভিযোগ উঠেছে, সাধারণ নিয়মে যেখানে ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত দুই মাস সময় প্রয়োজন, সেখানে মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে দুটি বড় টার্মিনালের চুক্তি সই করেছে কর্তৃপক্ষ। গত ১৭ নভেম্বর ডেনমার্কের ‘এপিএম টার্মিনালস’-এর সঙ্গে লালদিয়ার চর কনটেইনার টার্মিনাল এবং সুইজারল্যান্ডের ‘মেডলগ এসএ’-এর সঙ্গে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি হয়েছে। লালদিয়ার চর টার্মিনালটি ৪৮ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে, যার শর্তাবলি ও ট্যারিফ সংক্রান্ত বিষয়গুলো গোপন রাখা হয়েছে।
এছাড়া পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ইতিমধ্যেই সৌদি আরবের ‘রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল’ (আরএসজিটি) পরিচালনা করছে। লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং মেগাপ্রকল্প বে-টার্মিনালও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনালের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
অর্থনৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কা বন্দর ব্যবহারকারী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে বন্দরের মাশুল ও ফি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। পতেঙ্গা টার্মিনালের উদাহরণ টেনে ব্যবসায়ীরা জানান, যেখানে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রতি কনটেইনারে ৮০-৯০ ডলার আয় করত, সেখানে আরএসজিটি’র কাছ থেকে তারা পাবে মাত্র ১৮ ডলার। আয়ের বড় অংশই চলে যাবে বিদেশে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়বে, অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানি খরচ বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর। বিশেষ করে পোশাক শিল্পের রপ্তানি সক্ষমতা কমার আশঙ্কা করছেন রপ্তানিকারকরা।
মাঠে নেমেছে শ্রমিক ও রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় স্বার্থবিরোধী এই প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), বন্দর রক্ষা পরিষদ, বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শ্রমিক উইং পৃথকভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে।
এনসিটি ও সিসিটি বিদেশিদের হাতে না দেওয়ার দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার মশাল মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেছে বন্দর রক্ষা পরিষদ। শ্রমিক নেতারা ৪০ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। স্কপ-এর যুগ্ম সমন্বয়ক রিজওয়ানুর রহমান খান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “২২ নভেম্বরের মধ্যে এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে হরতাল ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করা হবে।”
সরকারের বক্তব্য তবে এসব অভিযোগের বিপরীতে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতেই বিদেশি ব্যবস্থাপনা যুক্ত করা হচ্ছে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সব ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থই প্রাধান্য পাবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশি অপারেটররা যুক্ত হলে বন্দরের সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনবে। তবে চালু ও লাভজনক টার্মিনালগুলো কেন বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নের সদুত্তর মিলছে না।
