রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে যাচ্ছে আসন্ন গণভোটে। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এই সংস্কার রূপরেখাকে আইনি ভিত্তি দিলেও এর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্ভর করছে জনগণের সম্মতির ওপর। তবে এই গণভোটে ‘না’ ভোট জয়ী হলে সংস্কারের ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এক বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ, সনদটি প্রত্যাখ্যান হলে এর বাস্তবায়নে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার আইনগতভাবে বাধ্য থাকবে না।
এই গণভোটে ‘না’ ভোটের জয়ের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হলো, সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টিসহ মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবকে একটিমাত্র প্রশ্নের অধীনে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের মুখোমুখি করা হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ সীমিত। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তাদের সমমনা দলগুলোর সনদের কিছু মৌলিক বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। এর মধ্যে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামোর কয়েকটি ধাপ অন্যতম। এই আপত্তির জায়গা থেকেই দলটির সমর্থকদের একটি অংশ ‘না’ ভোটের দিকে ঝুঁকতে পারে। সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক তার নির্বাচনী এলাকায় গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের সমর্থকেরাও অন্তর্বর্তী সরকারের এই উদ্যোগকে সফল হতে দিতে চাইবে না বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জুলাই সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া। ২৫টি রাজনৈতিক দল উচ্চকক্ষের পক্ষে থাকলেও এর গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের আপত্তি রয়েছে। সনদ অনুযায়ী, নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। কিন্তু বিএনপির দাবি, নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন করা হোক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল ধারণার সঙ্গে সব দল একমত হলেও সনদে বর্ণিত গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিএনপির ভিন্নমত স্পষ্ট।
গণভোটে যদি ‘না’ ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে সংস্কারের বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করবে আগামী নির্বাচনে জয়ী হওয়া দলের ওপর। তখন বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের ঘোষিত ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা’ অনুযায়ী সংস্কার কাজ এগিয়ে নিতে পারে। তবে সেই প্রস্তাবনা আবার জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলোর চাওয়ার সঙ্গে পুরোপুরি না-ও মিলতে পারে।
জুলাই সনদটি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও ‘না’ ভোটের ফলাফল মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার কথা বলেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঐতিহাসিকভাবে গণভোটে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হওয়ার হার কম হলেও (১৭৯০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত মাত্র ৬ শতাংশ) জনগণের রায়কে সম্মান জানাতে হবে।
গণভোট এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোটার উপস্থিতি নিয়ে সংশয় কম। তবে সংবিধানের মতো জটিল বিষয়ে সাধারণ ভোটারদের মতামত মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর নির্দেশনার ওপরই নির্ভর করবে। তাই দলগুলো তাদের সমর্থকদের যেভাবে উদ্বুদ্ধ করবে, গণভোটের ফল সেদিকেই যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে দেশে সংস্কারের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। কিন্তু ‘না’ ভোট জয়ী হলেও সংস্কারের সব পথ বন্ধ হবে না; কিছু বিষয় নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে সংবিধানের মৌলিক সংস্কারগুলো অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এবং তা নির্ভর করবে কেবলই ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।