ফোরটিন ডেস্ক : ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঘায়েল করতে দায়ের করা একের পর এক মামলার জালিয়াতি ও অসাড়তা এবার পুলিশের আনুষ্ঠানিক তদন্তেই বেরিয়ে এসেছে। হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগের আড়ালে সাজানো নাটক, অস্তিত্বহীন ব্যক্তি এবং জীবিত মানুষকে ‘মৃত’ বানিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার প্রমাণ পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। পুলিশ ও পিবিআই তদন্ত শেষে এসব মামলাকে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ হিসেবে চিহ্নিত করে শেখ হাসিনাসহ নেতাকর্মীদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের ১১ বছর বয়সী শিশু জিহাদ গুলিতে মারা গেছে দাবি করে শেখ হাসিনাসহ ১২৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্তে জানা যায়, জিহাদ জীবিত। পরবর্তীতে সে নিজেই আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে জবানবন্দি দিয়ে নিজের বেঁচে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে। একইভাবে রাজধানীর হাতিরঝিল থানার মামলায় পুলিশের গুলিতে নিহত দাবি করা মো. বাবু আসলে বহাল তবিয়তে সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছেন; তাঁর আসল নাম শাকিল। এমনকি বগুড়ায় রুটি গলায় আটকে মারা যাওয়া রিপন ফকিরকে ‘আন্দোলনে শহীদ’ বানিয়ে শেখ হাসিনাসহ কয়েকশ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছিল। আদালতের নির্দেশে মৃত্যুর ১১২ দিন পর কবর থেকে মরদেহ তুলে ময়নাতদন্তের পর ফরেনসিক বিভাগ নিশ্চিত করে, তাঁর শরীরে কোনো গুলির বা আঘাতের চিহ্নই ছিল না।
শুধু কাল্পনিক হত্যাকাণ্ডই নয়, হত্যাচেষ্টার নামেও নজিরবিহীন জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। মোহাম্মদপুরে নূর হোসেন নামে এক ব্যক্তি নয়টি গুলি লাগার মনগড়া দাবি করে শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করলেও পুলিশ তদন্তে দেখেছে, মামলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হাসপাতালের চিকিৎসাপত্র ও ক্যাশ মেমো সম্পূর্ণ ভুয়া ও জাল। এমনকি মোহাম্মদপুরের আরেক মামলায় সুমন নামের এক ব্যক্তি ‘স্ত্রী ফাতেমা গুলিতে নিহত’ দাবি করে শেখ হাসিনাকে আসামি করলেও পরে পুলিশের কাছে স্বীকার করেন যে তিনি ফাতেমা নামে কাউকে চেনেনই না; আর্থিক প্রলোভন ও রাজনৈতিক চাপে পড়ে এই ভুয়া মামলা করেছিলেন।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং থানা-পুলিশের তদন্তে একের পর এক মামলায় দেখা গেছে, বাদীর কোনো হদিস নেই, ঘটনাস্থলের মিল নেই এবং নিহত দাবি করা ব্যক্তির কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। একই মরদেহ দেখিয়ে একাধিক থানায় পৃথক মামলা করে শেখ হাসিনা ও দলীয় নেতাকর্মীদের জড়িয়ে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল। স্বয়ং তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার এস এম সাজ্জাত আলীও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে, মামলাকে ঢাল বানিয়ে অর্থ আদায়ের অপচেষ্টা চলছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর পর্যালোচনায় স্পষ্ট উঠে এসেছে যে, বিরোধী মত দমন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে প্রায় লাখখানেক মানুষকে গণমামলায় জড়ানো হয়েছে। শেখ হাসিনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শুরু থেকেই বলে আসছিলেন যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রহসনের অংশ হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার পাহাড় সাজানো হয়েছে। পুলিশের সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদনগুলো সেই সত্যকেই নতুন করে প্রমাণ করল।
