নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার : দিনে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ আর রাতের বেলা ঘন অন্ধকার—এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে শুরু হয়েছে পর্যটন মৌসুম। ঠিক এই সংকটময় সময়ে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুতের নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি। দ্বীপটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী একমাত্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড’ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম একলাফে ১০ টাকা বাড়িয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী আবাসিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি ৫২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের গুণতে হচ্ছে রেকর্ড ৬২ টাকা।
স্বল্প সরবরাহের মধ্যে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির এই ঘটনায় দ্বীপের আড়াই শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট মালিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্রাতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আইনি মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে থাকা সেন্ট মার্টিনবাসীকে জিম্মি করে বেসরকারি কোম্পানিটি একচেটিয়া ব্যবসা ফেঁদে বসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশির দশকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জেনারেটরের মাধ্যমে দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহ করত। তবে ১৯৯৪ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে সঞ্চালন লাইন ও খুঁটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর সরকারি উদ্যোগ পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়ে। পরবর্তীতে দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লু মেরিন এনার্জি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দ্বীপে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কোনো টেকসই উন্নয়ন হয়নি।
বর্তমান পর্যটন মৌসুমে আড়াই শতাধিক রিসোর্ট ও দুই শতাধিক রেস্তোরাঁর চাপে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোওয়াটে পৌঁছালেও সৌর প্রকল্প থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৩৮ কিলোওয়াট। ঘাটতি মেটাতে দ্বীপজুড়ে চলছে তিন শতাধিক উচ্চশব্দের ব্যক্তি-মালিকানাধীন ডিজেল জেনারেটর। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব জেনারেটরের তীব্র শব্দ ও কম্পনের কারণে সৈকতে মা কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্লু মেরিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ব্যাটারিচালিত কয়েকশ ইজিবাইকের বাড়তি চাপ, চোরাই সংযোগ এবং টেকনাফ থেকে লিটারপ্রতি অতিরিক্ত ৪০ টাকা খরচ দিয়ে ডিজেল আনার ব্যয়ের কারণে তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। এ ছাড়া প্রকল্পের অধিকাংশ ব্যাটারি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তবে সাধারণ বাসিন্দাদের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মনগড়া দাম মেনে নেওয়া হবে না। অবিলম্বে সাবমেরিন ক্যাবল বা সরকারি সোলার-বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে পিডিবির অধীনে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, স্থানীয়দের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া একতরফাভাবে এই দাম বাড়ানোর কোনো প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়নি কর্তৃপক্ষ।
