ফোরটিন ডেস্ক : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিচারহীনভাবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির ভাষ্যমতে, স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শ ও বিশ্বাসের কারণে নেওয়া এসব চরম প্রতিশোধমূলক সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
লন্ডন থেকে ৪ নভেম্বর প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ জানায়, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তত ২০টিরও বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আশির ও নব্বইয়ের দশকের সংঘাতময় ও প্রতিশোধমূলক রাজনৈতিক দলভিত্তিক আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
সংস্থাটির এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী এক কড়া বার্তায় বলেন, ‘বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক চর্চার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কেবল স্বৈরাচারী শাসকদেরই এই মুক্ত আলোচনা ও মতাদর্শকে ভয় পাওয়া উচিত; শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারের ক্ষেত্রে এমনটা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। অতীতের দমন-পীড়নের অধ্যায় পেছনে ফেলে নতুন পথে এগোনো প্রয়োজন, ক্ষমতার রদবদল ঘটলেই পুরনো প্রতিহিংসামূলক আচরণের পুনরাবৃত্তি হওয়া কোনো গণতান্ত্রিক চর্চা হতে পারে না।’
প্রতিবেদনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়, নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অন্তত ৪৪ জন শিক্ষকের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; যার মধ্যে ৬ জনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ১৪ জনের বিরুদ্ধে বিতর্কিত তদন্ত চলছে। এ ছাড়া ১২৬ জন শিক্ষার্থীর সনদ স্থগিত ও সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ জন শিক্ষককে বরখাস্ত ও ৩৪ জনের কর্মপরিধি সীমিত করা হয়েছে এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্তসহ ৮৫ জন শিক্ষকের পদোন্নতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ উদাহরণ হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মশিউর রহমানের বিষয়টি সামনে এনেছে সংস্থাটি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তাঁকে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়। টকশোতে আন্দোলনকে ‘অবৈধ ও অযৌক্তিক’ বলা এবং গণভবনে উসকানি দেওয়ার যে অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তার কোনো সত্যতা পায়নি এইচআরডব্লিউ। এমনকি তিনি এসব অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো প্রমাণপত্র পাননি বলে জানিয়েছেন।
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ক্যাম্পাসে আয়োজিত একটি মিছিলকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক পূর্বা ইসলামকে বরখাস্ত করা হলেও সাংবাদিকদের ভিডিও ফুটেজে তাঁর স্লোগান দেওয়ার কোনো দৃশ্য মেলেনি। একই দিনে বরখাস্ত হওয়া অ্যানিমেল ব্রিডিং বিভাগের অধ্যাপক ইয়াহিয়া খন্দকার আন্দোলনের পুরোটা সময় ঢাকায় অবস্থান করলেও তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়; পরবর্তীতে উচ্চ আদালত তাঁর বরখাস্তাদেশ স্থগিত করলেও সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় উল্টো এর বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
এইচআরডব্লিউ উল্লেখ করে, ইতোমধ্যেই তিনজন শিক্ষককে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং অন্য একজন বিচারাধীন রয়েছেন। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশ, টেলিভিশন টকশো বা প্রোগ্রেসিভ গ্রুপে সক্রিয় থাকার কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু বানানো শিক্ষা অঙ্গনে মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও বাকস্বাধীনতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
