নিজস্ব প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি বাতিল, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তিসহ সব অসম বৈদেশিক চুক্তি বাতিল, ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ বন্ধ এবং সুন্দরবন রক্ষাসহ বিভিন্ন দাবিতে সমাবেশ করেছে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সামরিক জোটে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ বন্ধ এবং দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি।
শুক্রবার বিকেল ৩টায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে আগামী দুই মাস জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সভা-সমাবেশ, পদযাত্রা ও গণসংযোগের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দাবিগুলো পূরণ না হলে আগামী ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল ও স্মারকলিপি পেশ করা হবে বলে ঘোষণা দেন জোটের নেতারা।
জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন জোটের কেন্দ্রীয় নেতা সাজ্জাদ জহির চন্দন, শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী, ইকবাল কবির জাহিদ, ডা. মুশতাক হোসেন, মাসুদ রানা, মোশরেফা মিশু, হারুনার রশীদ ভূইয়া, রজত হুদা, আব্দুল আলী, শিবলুল বারী রাজু, সৈয়দ হারুন অর রশীদ ও শহীদুল ইসলাম। সমাবেশ পরিচালনা করেন আব্দুল্লাহ আল ক্কাফী রতন। এ সময় প্রবীণ বামপন্থি নেতা মঞ্জুরুল আহসান খান, খালেকুজ্জামান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, মো. শাহ আলম, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, কবি মোহন রায়হানসহ বিভিন্ন ছাত্র, যুব, নারী, শ্রমিক, কৃষক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশের আগে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিল্পীরা গণসংগীত পরিবেশন করেন। আবৃত্তি করেন হাসান ফখরী। পরে সমাবেশে জোটের লিখিত ঘোষণা, প্রস্তাবনা ও আন্দোলনের কর্মসূচি তুলে ধরেন জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ।
সমাবেশে নেতারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্যচুক্তি করেছে, তা দেশের অর্থনীতি, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তাকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে তাঁরা মনে করেন। তাঁদের ভাষ্য, চুক্তিটি দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই জাতীয় স্বার্থবিরোধী এই চুক্তি বাতিলের দাবিতে তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
নেতারা অভিযোগ করেন, বর্তমান বিএনপি সরকার জনমত উপেক্ষা করে চুক্তিটি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটও চুক্তির বিরোধিতা না করে কার্যত একে সমর্থন করছে বলে দাবি করেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, বাম, প্রগতিশীল, দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক শক্তির নেতৃত্বে গঠিত সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটই চুক্তি বাতিলের দাবিতে সোচ্চার রয়েছে।
নেতাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। কোনো চুক্তির কারণে জাতীয় অর্থনীতি, নিরাপত্তা কিংবা সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে তা জনসমক্ষে পর্যালোচনা করতে হবে। দেশের জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বৈদেশিক চুক্তি সম্পাদন ও বাস্তবায়নের দাবি জানান তাঁরা।
সমাবেশে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তিরও বিরোধিতা করেন জোটের নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের টার্মিনালগুলো বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য উদ্বেগজনক।
নেতারা বলেন, সমুদ্রবন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি, বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। বন্দরের কার্যক্রমের সঙ্গে দেশের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা ও রাজস্ব আয়ের বিষয়গুলো সরাসরি যুক্ত। এ কারণে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তি বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী সব অসম বৈদেশিক চুক্তি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
বন্দরকে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে নেতারা বলেন, জাতীয় সম্পদ ও কৌশলগত অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁদের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামোর ওপর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ বাড়লে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রভাব তৈরি হতে পারে।
সমাবেশ থেকে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি করার উদ্যোগ বন্ধের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে সুন্দরবন ধ্বংস করে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা বন্ধের আহ্বান জানান নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তার নামে পরিবেশ, কৃষিজমি, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে এমন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নেতারা বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য ও জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। কয়লা উত্তোলন কিংবা জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে তার পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা জরুরি। তাঁরা ফুলবাড়ী ও সুন্দরবনকে ঘিরে বিতর্কিত উদ্যোগ বন্ধের দাবি জানান।
বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সামরিক জোটে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টারও বিরোধিতা করেছে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট। সমাবেশে নেতারা দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ, সামরিক আগ্রাসন ও আধিপত্য বিস্তারের নীতির সমালোচনা করেন। তাঁদের বক্তব্য, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে তার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে জনগণের মতামত ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করা জরুরি।
নেতারা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সামরিক আগ্রাসনের ফলে সাধারণ মানুষ প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান তাঁরা।
সমাবেশে বক্তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় আধিপত্যবাদবিরোধী যে স্লোগান উচ্চারিত হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার সঙ্গে সরকারের নীতির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এক দেশের আধিপত্যের বিরোধিতা করে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক শক্তিগুলো অন্য শক্তির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কাছে নতিস্বীকার করছে। বক্তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি ও প্রকল্প নিয়ে উত্থাপিত সমালোচনার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি, অতীতে ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী বক্তব্যের পাশাপাশি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নজির রয়েছে। একই ধরনের নীতিগত অসংগতি বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
সমাবেশে মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় ও ঠিকাদারি কাজ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় নির্ধারণ, চুক্তি সম্পাদন ও ঠিকাদার নির্বাচনসহ সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে এসব বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগ ও পরিসংখ্যানের স্বাধীন যাচাই সমাবেশের বক্তব্যে দেওয়া হয়নি। নেতারা আরও বলেন, দেশের শাসকগোষ্ঠীর নীতি যদি জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে দেশি-বিদেশি পুঁজির স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে জাতীয় সম্পদ ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তাঁরা।
সমাবেশ থেকে দেশ, জনগণ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষায় শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষ, ছাত্র, যুব, নারী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও পেশাজীবীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। নেতারা বলেন, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে সাধারণ মানুষের অধিকার ও স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংগঠিত গণআন্দোলনের বিকল্প নেই। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জোরদার করার আহ্বান জানান তাঁরা।
সমাবেশে ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী দুই মাস জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সভা-সমাবেশ, পদযাত্রা এবং গণসংযোগ করবে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে বাণিজ্যচুক্তি বাতিল, বন্দর ইজারা চুক্তি বাতিল, অসম বৈদেশিক চুক্তি পর্যালোচনা এবং ফুলবাড়ী ও সুন্দরবন রক্ষাসহ বিভিন্ন দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। জোটের নেতারা ঘোষণা দেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবিগুলো পূরণ না হলে আগামী ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় সমাবেশ করা হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে স্মারকলিপি পেশ করা হবে। নেতারা বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের অধিকার রক্ষার দাবিতে তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আন্দোলনকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তাঁরা।
