ফোরটিন ডেস্ক : বাংলা শিশুসাহিত্যে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সৃজনশীল অবদান রেখে চলেছেন কথাসাহিত্যিক ও শিশুসাহিত্যিক হুমায়ূন কবীর ঢালী। ছড়া, গল্প, উপন্যাস, রূপকথা, ভৌতিক কাহিনি ও ভ্রমণসাহিত্যসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর বিচরণ। শিশু-কিশোরদের কল্পনাশক্তি বিকাশ, মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং বাংলা শিশুসাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিশেষ নিবন্ধে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৪ সালের ৩০ অক্টোবর চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার সিকিরচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন কবীর ঢালী। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে মেঘনা ও ধনাগোদা নদীর তীরবর্তী গ্রামীণ পরিবেশে। গ্রামের প্রকৃতি, লোকজ সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন এবং শৈশবের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।
হুমায়ূন কবীর ঢালীর লেখায় শিশুদের কল্পনা, প্রকৃতিপ্রেম, পারিবারিক আবেগ, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধ গুরুত্ব পেয়েছে। শিশুমনের সরলতা ও কৌতূহলকে সাহিত্যের ভাষায় তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, দেশপ্রেম এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়েও লিখেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘দুই ছেলের গল্প’, ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’, ‘কাকের ছা কঙ্কাবতী ’, ‘লজিংবাড়ি’, ‘আয় ফিরে যাই’, ‘দেশবিদেশের রূপকথা’, ‘সব ভূত অদ্ভুত’ ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প’, এবং ‘কাকছানার বন্ধু মুরগিছানা’। নিবন্ধে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশু-কিশোরদের উপযোগী সাহিত্য রচনার পাশাপাশি ভ্রমণকাহিনি ও অন্যান্য সাহিত্যধারাতেও তিনি কাজ করেছেন। তাঁর লেখায় গ্রামীণ জীবনের রূপ, মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং দেশীয় সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে।
হুমায়ূন কবীর ঢালীর সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষার পরিসর ছাড়িয়ে অন্য ভাষার পাঠকদের কাছেও পৌঁছেছে। প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, তাঁর রচনা ও বইয়ের বিভিন্ন অংশ ইতালীয়, হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া ও নেপালি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও তাঁর শিশুসাহিত্য পাঠকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে।
নিবন্ধে তাঁর ‘A Cowboy and a Magic Mango Tree’ এবং ‘The Birthday Gift’ বইয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরোপের শ্রেণিকক্ষে বাংলাদেশের একজন লেখকের লেখা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে নিবন্ধে বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতির একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
শুধু লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ না থেকে শিশুসাহিত্যের সামগ্রিক বিকাশেও কাজ করেছেন হুমায়ূন কবীর ঢালী। নিবন্ধে তাঁকে ‘বাংলাদেশ শিশুসাহিত্যিক ফোরাম’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংগঠনের মাধ্যমে নবীন ও প্রবীণ লেখকদের একত্র করা, শিশুসাহিত্যের গুণগত মান উন্নয়ন এবং সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নতুন লেখকদের দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা শিশুসাহিত্যের পরিচিতি বাড়ানোর প্রচেষ্টাও তাঁর সাংগঠনিক কাজের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগও নিয়েছেন এই সাহিত্যিক। নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার সিকিরচর গ্রামে তিনি ‘আমাদের পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
গ্রামীণ শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষের বই পড়ার সুযোগ বৃদ্ধি, জ্ঞানচর্চা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশে পাঠাগারটি ভূমিকা রাখছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রামের শিশুদের বইয়ের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করার লক্ষ্যও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত।
শিশুসাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে হুমায়ূন কবীর ঢালী দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউনিসেফ প্রদত্ত মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড (২০১২), এম নূরুল কাদের ফাউন্ডেশন শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১৩), অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক (২০০৬), সালেহীন মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড (২০০৬), কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ স্মৃতি স্বর্ণপদক (২০০৭), নওয়াব ফয়জুন্নেছা স্বর্ণপদক (২০০৮), পদক্ষেপ শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১১) এবং ঝুমঝুমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১৮)।
এ ছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে চোখ সাহিত্য পুরস্কার (২০১৩), তোরষা সাহিত্য সম্মাননা (২০২০) এবং ওড়িশার লেখালেখি সাহিত্য সম্মাননা (২০১৯) পাওয়ার কথাও নিবন্ধে বলা হয়েছে।
হুমায়ূন কবীর ঢালীর সাহিত্যভাবনায় বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশপ্রেমের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশুদের উপযোগী ভাষায় ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘটনা তুলে ধরার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার প্রত্যাশাও তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে।
৬২তম জন্মবার্ষিকীতে হুমায়ূন কবীর ঢালীর সাহিত্যজীবন, শিশুসাহিত্যে অবদান এবং পাঠাভ্যাস বিস্তারে উদ্যোগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে। শিশু-কিশোরদের কল্পনা ও মনন বিকাশে তাঁর সৃষ্টিশীলতা আগামী দিনেও বাংলা সাহিত্যে অবদান রাখবে, এমন প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়েছে।
