ঢাকা ব্যুরো : রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তা কে এম তাওসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে ঘনীভূত হচ্ছে রহস্যের কালো মেঘ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক হেলিকপ্টারে দেশত্যাগের চাঞ্চল্যকর দৃশ্য ধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ততার দাবি, পরবর্তীতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর এজেন্ট হিসেবে অভিযুক্ত হওয়া এবং চাকরিচ্যুতির মতো নাটকীয় ঘটনার ধারাবাহিকতায় এবার তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার হলো নদী থেকে। এই করুণ পরিণতি নিছক কোনো দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে গভীর কোনো রাজনৈতিক বা গোয়েন্দা ষড়যন্ত্র রয়েছে—তা নিয়ে দেশজুড়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সামরিক হেলিকপ্টারে ওঠার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সূত্রে দাবি ওঠে, তাওসিফ সৌরি নিজেই এই দৃশ্য ধারণ করেছিলেন। তবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ঘটনার গতিপ্রকৃতি ভিন্ন রূপ নেয়। দৈনিক ‘আমার দেশ’ পত্রিকাসহ একাধিক সূত্রে তাঁকে ‘র’-এর এজেন্ট হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় এবং একপর্যায়ে তাঁকে বিমান বাহিনীর চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। তবে কোনো স্বাধীন বা আনুষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।
চাকরি হারানোর পর থেকেই চরম মানসিক চাপ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন তাওসিফ সৌরি। এর মধ্যেই সম্প্রতি তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। নিখোঁজের কিছুদিন পর তুরাগ নদে ভেসে ওঠে তাঁর মরদেহ। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাথমিক সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট না করা হলেও, লাশ উদ্ধারের ধরন ও সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে এটিকে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে জোর সন্দেহ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, ৫ আগস্টের সেই সংবেদনশীল মুহূর্ত এবং সামরিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির এমন কিছু গোপন তথ্য হয়তো তাওসিফের জানা ছিল, যা প্রকাশ্যে এলে অনেক প্রভাবশালী পক্ষের জন্য বড় সংকট তৈরি হতে পারত। অন্যদিকে, এ মৃত্যুকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ও গোয়েন্দা সংস্থার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে পারস্পরিক দোষারোপ শুরু হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার ওপর গুরুতর অভিযোগ আনা, চাকরিচ্যুতি এবং পরবর্তীতে তুরাগ নদে তাঁর মরদেহ পাওয়ার ঘটনা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের ওপর বড় প্রশ্ন তুলেছে। পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ সত্যতা উন্মোচন এবং মৃত্যুর আসল রহস্য উদ্ঘাটনে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন বিচারিক তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে ‘র’-এর এজেন্ট সংক্রান্ত অভিযোগের সূত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলদেরও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।