নিজস্ব প্রতিবেদক, পিরোজপুরের চিতলিয়া গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনার পর এখনো আতঙ্কে রয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। গ্রামের বাসিন্দা ও স্বজনেরা বলেছেন, কারও লাশ দাফনে বাধা এবং খোঁড়া কবর মাটি ফেলে ভরাট করে দেওয়ার মতো ঘটনা এ গ্রামে আগে কখনো ঘটেনি। একজন মুক্তিযোদ্ধার এমন শেষবিদায় মানতে পারছেন না তাঁরা।
লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনে বাধা, খোঁড়া কবরে মাটি ভরাট করা, কবর খোঁড়ায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার ভীতি—দিনভর চলা এসব ঘটনার পর গত শনিবার গভীর রাতে পুলিশি পাহারায় মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বে মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
“নিরাপত্তার স্বার্থে মৃতদেহ পুলিশ লাইনসের ভেতরে নিয়ে জানাজা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সংঘাত, সহিংসতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে কিছু কৌশল নেওয়া হয়েছিল।”
পিরোজপুর জেলার পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান
পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে পিরোজপুর সদর থানায় মামলা হয়। এ মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলাকালে মানিক পশারী এ মামলায় সাক্ষ্য দেন।
এলাকায় কথা বলে জানা যায়, মানিক পশারী মারা যান শনিবার সকালে মেয়ে আফরোজা পশারীর গোপালগঞ্জের বাড়িতে। দুপুর ১২টার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁর মরদেহ নেওয়া হয় পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে। এ খবর পেয়ে পিরোজপুর শহরের বটতলা, পুলিশ লাইনস সড়ক, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, পাড়েরহাট বাজার, পৌর কবরস্থানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াত-শিবিরের কর্মী-সমর্থকেরা জড়ো হয়ে মিছিল বের করেন। মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে নানা স্লোগান দেন তাঁরা। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা (গার্ড অব অনার) না দিতে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনকে চাপ দেওয়া হয়। পিরোজপুরে কবর দিতে দেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা দেন তাঁরা।
পুলিশের একটি সূত্র বলছে, লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে হামলা ও দাফনে বাধা দেওয়া হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে মানিক পশারীর মরদেহ পিরোজপুর পুলিশ লাইনস মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জানাজা হয় এবং ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। এ সময় দাফনে বাধা দেওয়ার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে স্থানীয় সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন দিয়ে বলেন, দলীয় নেতা-কর্মীদের বলে দেওয়া হয়েছে, তাঁরা লাশ দাফনে আর বাধা দেবেন না। পরে গভীর রাতে পুলিশি পাহারায় বিকল্প সড়ক দিয়ে মরদেহ গ্রামে নিয়ে দাফন করা হয়।
পিরোজপুর জেলার পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে মৃতদেহ পুলিশ লাইনসের ভেতরে নিয়ে জানাজা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সংঘাত, সহিংসতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে কিছু কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
বাধা দেওয়ার নেতৃত্বে জামায়াত নেতা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা, দাফন ও গার্ড অব অনারে বাধা দিতে শহরের বিভিন্ন স্থানে মিছিল-সভার নেতৃত্ব দেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল রাজ্জাক, পৌর জামায়াতের আমির ইসহাক আলী, জিয়ানগর উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি ও সাবেক শিবির নেতা মামুন হোসাইন। আর মানিক পশারীর গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে খোঁড়া কবরে মাটি ভরাট করা, কবরের জন্য আনা বাঁশ সরিয়ে ফেলা ও নেতা-কর্মীদের নিয়ে মিছিল করেন পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুইন উদ্দিন।
পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদের সামনে ওই দিন দেওয়া বক্তব্যে আব্দুল রাজ্জাক বলেছিলেন, লাশ দাফনে তাঁরা কোনো বাধা দেবেন না। কিন্তু মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তাঁকে কেন গার্ড অব অনার দেওয়া হবে—সেটার প্রতিবাদ জানাতে জড়ো হয়েছেন তাঁরা।
গতকাল মঙ্গলবার যোগাযোগ করা হলে আব্দুল রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গার্ড অব অনার যাতে দেওয়া না হয়, সেটা বলেছিলাম।’ তাঁর দাবি, যখন প্রশাসন থেকে বলা হলো, মানিক পশারী সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা, তখন আর বাধা দেওয়া হয়নি; বরং লাশ দাফনে তাঁরা সহযোগিতা করেছেন।
এ বিষয়ে জামায়াতের কর্মী মুইন উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি লোকজন নিয়ে মানিক পশারীর গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে নেতা-কর্মীদের নিয়ে মিছিল করেছেন। তবে খোঁড়া কবরে মাটি দিয়ে ভরাট করার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।
একজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এলাকার অনেক প্রবীণ ব্যক্তি নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, জামায়াত নেতা আব্দুল রাজ্জাকসহ কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে কয়েক শ নেতা-কর্মী শহরের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনপ্রক্রিয়ায় বাধা দেন।
একজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এলাকার অনেক প্রবীণ ব্যক্তি নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, জামায়াত নেতা আব্দুল রাজ্জাকসহ কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে কয়েক শ নেতা-কর্মী শহরের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনপ্রক্রিয়ায় বাধা দেন।
Comments
