ফোরটিন ডেস্ক : গণতান্ত্রিক দেশে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার থাকলেও বাংলাদেশে সরকারের সামান্য সমালোচনা করলেই নেমে আসছে গ্রেফতার ও দমনপীড়নের খড়্গ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের নীতি বা স্থানীয় নেতাদের ব্যর্থতা নিয়ে সাধারণ নাগরিকের ক্ষোভ প্রকাশ, রাজনৈতিক কার্টুন আঁকা কিংবা বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অসন্তোষ জানালেই নাগরিকদের সন্ত্রাসবিরোধী ও সাইবার আইনে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। সম্প্রতি ময়মনসিংহের ভালুকায় চুরির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ‘বিএনপিকে ভোট দিয়ে ভুক্তভোগী’ বলায় নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাটি এই দমনমূলক বাস্তবতাকে আবারও নগ্নভাবে সামনে এনেছে।
ভালুকার ঘটনায় খোদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্বীকার করেছেন, সাথী আক্তারের ভিডিও বারবার দেখেও সরকারবিরোধী কোনো উপাদান পাওয়া যায়নি এবং তাঁর কথা বাক্স্বাধীনতার মধ্যেই পড়ে। অথচ স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীদের চাপে অপরাধ প্রতিরোধমূলক আইনের অপপ্রয়োগ করে ওই নারীকে জেলে পাঠানো হয়।
মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন পক্ষের তথ্য বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক মাসে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি ও ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করায় ধারাবাহিক গ্রেফতার অভিযান চলছে। কুষ্টিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর বাংলা উচ্চারণ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে মন্তব্য করায় শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে আটক, গাজীপুরে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করায় শিক্ষার্থী সিফাত আবদুল্লাহকে সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেফতার এবং সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিকে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করায় কনটেন্ট নির্মাতা এ এম হাসান নাসিমকে সাইবার সুরক্ষা আইনে গ্রেফতার করা হয়। এমনকি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের দায়ে দৈনিক ‘অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ রেজানুর ইসলামকেও চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতারের শিকার হতে হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তথ্যমতে, তিন মাসেই সাইবার সুরক্ষা আইনে ১০টি মামলায় ৩২ জনকে অভিযুক্ত ও ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্টের দায়ে অন্তত আটজনকে আটক করা হয়। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন, মতপ্রকাশের জেরে সম্প্রতি অন্তত ২২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) রাজনৈতিক বক্তব্যকে অপরাধের আওতায় এনে ভিন্নমত দমনের এই বিপজ্জনক প্রবণতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
আইন বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত বাক্স্বাধীনতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৫১ ধারা, সাইবার আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের নির্বিচার অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে। কোনো নাগরিকের ক্ষোভ বা ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনা সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হলেই তাঁকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে পুরোনো মামলায় ফাঁসানোর এই স্বৈরাচারী কৌশল গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে।
