ফোরটিন ডেস্ক : রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ৫৪৫ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছে সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পর এক সপ্তাহে ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং আইনি প্রক্রিয়ায় এগোনো নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) সূত্র জানায়, তালিকাটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন শাখাকে সরবরাহ করা হয়েছে। গত সোমবার পর্যন্ত ডিএমপির অভিযানে তালিকাভুক্ত ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তালিকায় ৫৪৫ জন, তেজগাঁও বিভাগে ১৫৬
ডিএমপি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫৪৫ জনের তালিকায় তেজগাঁও বিভাগের ১৫৬ জনের নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকে ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে অপকর্ম করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তাঁদের কারও কারও সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম , তালিকা পাওয়ার পর এক সপ্তাহ ধরে গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। গত সোমবার পর্যন্ত ডিএমপি ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
তিনি জানান, যাঁদের বিরুদ্ধে পুরোনো মামলা রয়েছে, তাঁদের সেসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। অভিযানে অস্ত্র পাওয়া গেলে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। আর যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটক রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
গ্রেপ্তারের পর মামলা নিয়ে সংশয়
তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কীভাবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। ডিএমপির ডিবির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তালিকা তৈরি করেছে এবং তালিকাভুক্তদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিরা প্রভাবশালী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করতে অনীহা দেখাতে পারেন। আবার এজাহারে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না থাকলে অভিযুক্তরা জামিনে মুক্তি পেতে পারেন।
ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, গ্রেপ্তারের পর কেউ দ্রুত জামিনে মুক্তি পেলে আইন মানার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তির বক্তব্য
ডিএমপির তালিকায় নাম থাকা শাহিনুর আলম মারফতকে গত ৪ অক্টোবর খিলক্ষেত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি। তিনি খিলক্ষেত থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পরদিনই তিনি জামিনে মুক্তি পান।
খিলক্ষেত থানার ওসি সোরহাব আল হোসাইন জানান, চাঁদাবাজির অভিযোগে শাহিনুর আলমকে আটক করে এসআরবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছিল। তবে এসআরবি কোনো মামলা করেনি। পরে ডিবি তাঁকে নিয়ে যায়।
তালিকায় নিজের নাম থাকার বিষয়ে শাহিনুর আলম মারফত দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রের কারণে তাঁর নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি নিজেকে রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের শিকার বলেও উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, রাজধানীর মতিঝিল এলাকা থেকে লিটন চোকদার নামের আরেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে তেজগাঁও থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ডিএমপির তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ ক্ষমতা আইনের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা
তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আইনটির প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, যে আইনই প্রয়োগ তিনি বলেন, বর্তমান সরকার চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। তা বাস্তবায়নে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে বেআইনি আটক ও নিরীহ ব্যক্তিদের হয়রানি এড়িয়ে আইন অনুযায়ী কাজ করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা ও চলমান অভিযান
ডিএমপি সূত্র জানায়, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের আটকের পর কীভাবে আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে, তা নিয়ে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি আপাতত আটক ব্যক্তিদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে নিয়মিত মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কথা বলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের পরবর্তী নির্দেশনা তৈরির কাজ চলছে।
ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মোহাম্মদ শাহীন জানান, তাঁদের বিভাগে তালিকাভুক্ত ২০ থেকে ২৫ জনের নাম রয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে, তবে কয়েকজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এসআরবির মুখপাত্র ও বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গোয়েন্দা তালিকা পাওয়ার পর চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। রাজধানীর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য স্থানেও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তবে দেশব্যাপী চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
