নিজস্ব প্রতিবেদক
আর্থিক সংকটে থাকা দেশের ছয়টি ব্যাংকে রাখা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ১ হাজার ২৬২ কোটি টাকার বেশি স্থায়ী আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এসব ব্যাংকে জমে থাকা মেয়াদোত্তীর্ণ আমানত সুরক্ষিত রাখতে এবং তা দ্রুত ফেরত আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো তাগিদ দিয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির পঞ্চম বৈঠকে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালন কার্যক্রম এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনাকালে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। কমিটির সভাপতি ও সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের মোট স্থায়ী আমানতের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ১৩৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকার অধিক। এর মধ্যে তারল্য সংকটে ধুঁকতে থাকা ছয়টি ব্যাংকে জমা ছিল ১ হাজার ২৬২ কোটি ১৬ লাখ ৭৮ হাজার ৩৮৪ টাকা, যা মোট স্থায়ী আমানতের প্রায় ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সংকটাপন্ন পদ্মা ব্যাংকে চট্টগ্রাম বন্দরের স্থায়ী আমানত ছিল ১৭৯ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া অপর পাঁচ ব্যাংক—গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে সম্মিলিতভাবে জমা ছিল ১ হাজার ৮২ কোটি ৮৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৮৪ টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তালিকাভুক্ত এই ব্যাংকগুলো বর্তমানে মারাত্মক তারল্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমানতকারীদের নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থ ব্যাংকগুলোর হাতে নেই।
বন্দর কর্তৃপক্ষের আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্ট ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড (আইএফআরএস-৯) অনুযায়ী সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে প্রয়োজনীয় হিসাবভিত্তিক সংস্থান বা প্রভিশন রাখা হয়নি—এমন কড়া আপত্তিও তোলা হয়েছে নিরীক্ষায়। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখিত পুরো অর্থই সম্পূর্ণ ডুবে গেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।
নিরীক্ষার আওতায় থাকা সংকটে পড়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একত্রিত করে ইতিমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকটি ব্যক্তি শ্রেণির আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা শুরু করলেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতো বড় প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের আটকে থাকা অর্থ ফেরত পাওয়ার বর্তমান অবস্থা ও নীতিমালা সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সরকারি অর্থের যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং বন্দরগুলোর দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত নিরীক্ষা আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়।
বৈঠকে কমিটির সংশ্লিষ্ট সদস্যবৃন্দ ছাড়াও হিসাব মহানিয়ন্ত্রক, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বিভিন্ন বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
