ফোরটিন ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১ জন মার্কিন সামরিক সদস্যের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। আহত সেনার সংখ্যাও বেড়েছে। ১০ অক্টোবর প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে আহতের সংখ্যা ৮৬৫ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটিতে ৩ হাজার ৩৭৫ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এই সংখ্যার স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধের পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে নিহত সেনাদের ব্যক্তিগত জীবনের অসংখ্য অসমাপ্ত গল্প। কেউ ছিলেন সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণী, কেউ দেশে ফিরে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখছিলেন, আবার কেউ ছিলেন সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে চাওয়া একজন বাবা।
কুয়েতে হামলায় প্রাণ হারান ছয় সেনা
যুদ্ধে প্রথম মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ১ মার্চ। কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে একটি অস্থায়ী অপারেশন সেন্টারে ইরানি হামলায় ছয়জন আর্মি রিজার্ভ সদস্য নিহত হন।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন আইওয়ার ২০ বছর বয়সী ডেক্লান কোডি। বিদেশে দায়িত্ব পালন করলেও পরিবারের সঙ্গে ভিডিও গেম খেলা এবং অ্যানিমে নিয়ে গল্প করার মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন তিনি।
একই হামলায় প্রাণ হারান মিনেসোটার ৩৯ বছর বয়সী সার্জেন্ট নিকোল আমোর। দুই সন্তানের জননী এই সেনাসদস্যের কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়ি ফেরার কথা ছিল।
নিহত অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ফ্লোরিডার ৩৫ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন কোডি খর্ক, মার্শাল আর্টে ব্ল্যাক বেল্টধারী নেব্রাস্কার ৪২ বছর বয়সী সার্জেন্ট নোয়াহ টিটজেনস, তিন সন্তানের বাবা আইওয়ার ৪৫ বছর বয়সী মেজর জেফ্রি ও’ব্রায়েন এবং ভার্জিনিয়ার ৫৪ বছর বয়সী রবার্ট মারজান।
এর কয়েক দিন পর সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে হামলায় আহত হয়ে ৮ মার্চ মারা যান কেনটাকির ২৬ বছর বয়সী সার্জেন্ট বেঞ্জামিন পেনিংটন।
জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু
মার্চে ইরাকে মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন ক্রু সদস্য নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মেজর জন ‘অ্যালেক্স’ ক্লিনার। তাঁর দুই বছর বয়সী একটি সন্তান এবং সাত মাস বয়সী যমজ সন্তান ছিল।
একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৩১ বছর বয়সী নারী পাইলট ক্যাপ্টেন আরিয়ানা জি. সাভিনো, দুই সন্তানের মা ৩৪ বছর বয়সী টেকনিক্যাল সার্জেন্ট অ্যাশলে বি. প্রুইট, ওহাইওর ৩৮ বছর বয়সী পাইলট ক্যাপ্টেন সেথ আর. কোভাল এবং ৩০ বছর বয়সী অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার ক্যাপ্টেন কার্টিস জে. অ্যাংস্ট।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন টেকনিক্যাল সার্জেন্ট টাইলার এইচ. সিমন্স, যিনি ছিলেন তাঁর মা-বাবার একমাত্র সন্তান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত্যুর এক দিন আগে বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে হয়তো আর বাড়ি ফেরা হবে না।
জর্ডানে হামলায় নিহত তরুণ সেনাসদস্যরা
জুলাইয়ে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলায় আরও তিন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন বলে মার্কিন সামরিক সূত্রে জানানো হয়।
নিহতদের একজন ছিলেন টেক্সাসের ১৯ বছর বয়সী ইসাবেলা গঞ্জালেস। হাইস্কুল শেষ করার পরপরই তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন।
আরেকজন ছিলেন নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠা ত্রিনিদাদে জন্ম নেওয়া অ্যাঞ্জেল রামপারসাদ। একই হামলায় আহত হয়ে পরদিন, ১৮ জুলাই, মারা যান হাওয়াইয়ের ২৫ বছর বয়সী টাইলার জেমস ফিহান।
এমবিএ ডিগ্রি সম্পন্ন করার মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি ছিল ফিহানের। দেশে ফিরে প্রেমিকা ক্লেয়ার ফ্লেচারকে বিয়ে করা এবং আইন বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। মৃত্যুর আগে প্রেমিকাকে পাঠানো শেষ বার্তায় তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’।
ইরাকে ড্রোন নিষ্ক্রিয় করতে গিয়ে মৃত্যু
১৯ জুলাই উত্তর ইরাকের এরবিল বিমানঘাঁটিতে একটি ভূপাতিত ড্রোন নিষ্ক্রিয় করার সময় নিহত হন ৩০ বছর বয়সী সার্জেন্ট মাইকেল ইমানুয়েল সুইনটন।
চার বছর বয়সী এক কন্যাসন্তানের বাবা সুইনটন মৃত্যুর প্রায় এক মাস আগে স্ত্রীকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যু হলে সন্তানরা যেন জানতে পারে, বাবা তাদের কতটা ভালোবাসতেন।
এদিকে, আরব সাগরে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর নৌবাহিনীর কমান্ডার গ্যাব্রিয়েল এডওয়ার্ডসের খোঁজে তল্লাশি চালানো হয়। দুই সন্তানের বাবা এই কর্মকর্তার সন্ধানে ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান চললেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ৫ জুলাই তাঁর উদ্ধার অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও প্রাণহানি
সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে সামরিক দায়িত্ব পালনকালেও প্রাণ হারিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
গত ৬ মার্চ কুয়েতের ক্যাম্প বুহরিংয়ে দায়িত্ব পালনকালে শারীরিক অসুস্থতায় মারা যান নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ ও ন্যাশনাল গার্ডের ৪৬ বছর বয়সী মেজর সর্ফলি ডেভিয়াস। ছয় সন্তানের বাবা ছিলেন তিনি।
সর্বশেষ ১৮ সেপ্টেম্বর কাতারে সামরিক অভিযানে সহায়তার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে বিমানের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে মারা যান ৩৭ বছর বয়সী মেজর বিয়াঙ্কা সি. উইলকারসন।
প্রাণহানির আশঙ্কা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প
গত মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিহত সেনাদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, এ ধরনের ঘটনা যুদ্ধ নিয়ে তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করবে না। সামনে আরও প্রাণহানি ঘটতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
পরবর্তী মাসগুলোতে নতুন করে মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। নিহতদের পরিবারগুলো একদিকে প্রিয়জন হারানোর শোক বহন করছে, অন্যদিকে তাদের অসমাপ্ত স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার স্মৃতি নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
যুদ্ধের সামরিক হিসাবের পাশাপাশি এসব ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি সংঘাতের মানবিক মূল্যও সামনে নিয়ে আসছে।
