ফোরটিন ডেস্ক : পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ইতিহাসে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি নিজ দেশের জনগোষ্ঠী ও প্রতিবেশী দেশের বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতার অভিযোগও রয়েছে। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও নির্যাতন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচ অধিকার আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘাত পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।
তবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিম হত্যাকারী বাহিনী’ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক তুলনামূলক পরিসংখ্যান নেই। তাই নথিভুক্ত ঘটনা ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতেই এই ইতিহাসকে দেখা প্রয়োজন।
১৯৭১: পূর্ব পাকিস্তানে সবচেয়ে বড় অধ্যায়
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও রক্তাক্ত অধ্যায়গুলোর একটি। ২৫ মার্চের সামরিক অভিযান থেকে শুরু করে নয় মাসের সংঘাতে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, নির্যাতন এবং গ্রাম-শহর ধ্বংসের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।
Human Rights Watch-এর ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের ব্যাপক সহিংসতা এবং ধর্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত হিসাব প্রায় ৩০ লাখ হলেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় এর চেয়ে ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়।
এই সংঘাতে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল বলেও Human Rights Watch-এর নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
জিয়াউল হকের সামরিক শাসন
১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন। এরপর দীর্ঘ সামরিক শাসনে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার, সামরিক আদালত ও দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ পর্যায়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা শুধু সীমান্ত বা যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনী সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান নেয়।
বেলুচিস্তানে দীর্ঘ সামরিক সংঘাত
বেলুচিস্তান পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাতের আরেকটি বড় ক্ষেত্র। বেলুচ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমনে সামরিক অভিযান এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা, বেআইনি আটক, নির্যাতন ও জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ বহু বছর ধরে উঠে আসছে।
Amnesty International-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সরকারি Commission of Inquiry on Enforced Disappearances ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ১২৫টি নতুন জোরপূর্বক গুমের মামলা নথিভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজের হিসাব আরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বেলুচিস্তানে গুমের অভিযোগ শুধু অতীতের ঘটনা নয়, সাম্প্রতিক সময়েও এটি পাকিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
খাইবার পাখতুনখোয়া ও সোয়াত
খাইবার পাখতুনখোয়া ও সোয়াত অঞ্চলেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দীর্ঘ সময় ধরে তালেবান ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে।
তালেবান ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা এবং বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সময়ে সামরিক অভিযানের সময় বেসামরিক হতাহত, বেআইনি আটক ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
ফলে এই অঞ্চলের সংঘাতকে শুধু সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হিসেবে দেখলে সামরিক অভিযানের মানবিক মূল্য ও বেসামরিক মানুষের অভিজ্ঞতার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
কাশ্মীর নিয়ে অভিযোগ
আজাদ কাশ্মীরের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার পরিস্থিতি নিয়েও পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বেআইনি আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।
তবে কাশ্মীরের ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে কতজন নিহত বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তার একটি নির্ভরযোগ্য ও সর্বসম্মত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। ফলে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা ব্যবহারে সতর্কতা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক আফগানিস্তান সংঘাত
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বেসামরিক হতাহতের সর্বশেষ আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর একটি আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত।
জাতিসংঘের আফগানিস্তান মিশন UNAMA জানায়, ২০২৫ সালের ১০ থেকে ১৭ অক্টোবরের সীমান্ত সংঘাতে আফগানিস্তানে ৪৭ জন বেসামরিক নিহত এবং ৪৫৬ জন আহত হন। ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে সীমান্ত সংঘাতের কারণে অন্তত ৭০ জন বেসামরিক নিহত এবং ৪৭৮ জন আহত হওয়ার তথ্যও UNAMA নথিভুক্ত করেছে।
২০২৬ সালের ২১ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আফগানিস্তানে চালানো বিমান হামলা নিয়ে UNAMA অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নিহত এবং সাতজন আহত হওয়ার প্রাথমিক তথ্য দেয়। নিহত ও আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল।
এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত UNAMA আফগানিস্তানে মোট ১৮৫ জন বেসামরিক হতাহত যাচাই করে। এর মধ্যে ৫৬ জন নিহত এবং ১২৯ জন আহত হন। এই হতাহতদের ৫৫ শতাংশ ছিলেন নারী ও শিশু।
২৮ জুন ২০২৬ পাকিস্তানি বাহিনীর বিমান হামলায় পাক্তিয়া, পাকতিকা ও কুনার প্রদেশে অন্তত ২৮ জন বেসামরিক নিহত এবং ৪৯ জন আহত হওয়ার তথ্য দেয় UNAMA। সংস্থাটি জানায়, নিহত ও আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ও ওই তিন প্রদেশে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল।
একই ইতিহাসে বারবার ফিরে আসে বেসামরিক মানুষের প্রশ্ন
১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তান থেকে বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া এবং সাম্প্রতিক আফগানিস্তান পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাগুলোর সময়, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংঘাতের ধরন এক নয়। কোথাও ছিল স্বাধীনতা আন্দোলন ও সামরিক দমন, কোথাও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত, আবার কোথাও সীমান্তে সশস্ত্র সংঘর্ষ। একই সঙ্গে এসব সংঘাতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতাও ছিল।
তবু বিভিন্ন সময়ের ঘটনাগুলোতে একটি বিষয় বারবার সামনে এসেছে, তা হলো সামরিক অভিযানের মধ্যে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নথি এবং জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য দেখায়, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে ঘিরে মানবাধিকার বিতর্ক শুধু ১৯৭১-এর ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। বেলুচিস্তানের জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ এবং আফগানিস্তানে সাম্প্রতিক বেসামরিক হতাহতের ঘটনাগুলোও সেই বিতর্ককে বর্তমান সময় পর্যন্ত টেনে এনেছে।
