ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্র সংসদ নেতৃবৃন্দ ডাকসুর ঐতিহ্য ও নির্দলীয় চরিত্র বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ডাকসু সদস্যরা কখনো পুলিশের ভূমিকা নিয়েছেন, কখনো ডাকসুকে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা প্রচারে ব্যবহার করেছেন, আবার কখনোবা শিক্ষকদের সঙ্গে দারুণ হঠকারী ব্যবহার করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ডাকসুতে নানা সময় বিতর্ক তৈরি হয়েছে, দলীয় লেজুড়বৃত্তিও হয়েছে, আবার ঐতিহ্যগতভাবে নির্দলীয় মনোভাব ধরে রেখে দায়িত্ব পালন করার বড় নজিরও রেখেছে ডাকসু। বাংলাদেশের একাধিক ক্রান্তিলগ্নে সব দলের ছাত্রনেতাদের একত্র করে বড় ভূমিকা রাখতে পেরেছে ডাকসু।
বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হওয়ায় নানা সময় ডাকসুর নির্দলীয় মনোভাব ধরে রাখা সম্ভব হয়েছিল। তবে এবার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রায় পুরোটা শিবির–সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত হওয়ায়, যারা আদর্শিক প্রভাব খাটাতে গিয়ে নানাভাবে বিতর্ক তৈরি করেছে।
শিক্ষক হেনস্তা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সময় বিভিন্ন মত ও ধারার শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকদের মধ্যে কে ধার্মিক, কে নাস্তিক, কে কমিউনিস্ট—এসব নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে মুখরোচক আলোচনা হতো, কিন্তু কোনো বিরূপতা ছিল না। দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তির কারণে যদিও শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন নিয়ে নানা সময় বিতর্ক ও সমালোচনা দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হেনস্তার ঘটনার কথাও খুব একটা শোনা যায় না। তবে এবার ডাকসু নেতাদের হাতে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীনকে হেনস্তার ঘটনা আলোচিত হয়। যদিও এ শিক্ষকের নামে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময় নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে; কিন্তু এভাবে হেনস্তার বিষয়টি কোনোভাবে কাম্য ছিল না। চাকসুতেও এ ধরনের শিক্ষক হেনস্তা ঘটে।
লেজুড়বৃত্তির কারণে আমাদের দেশে শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—সব রাজনীতিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতি সব সময় ছিল; আগেও শিক্ষার্থীরা রাজনীতি করতেন এবং শিক্ষকেরাও। তবে শিক্ষার্থী-শিক্ষক যাঁর যাঁর রাজনীতির পরিসর ছিল ভিন্ন। অনেকের মধ্যেই মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকলেও একটা সমীহ ছিল। শিক্ষকেরা কোথায় কী বিবৃতি দিয়েছেন, কার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন, কী বলেছেন, কী লিখেছেন—এই নিয়ে শিক্ষার্থীদের কারও কারও হয়তো অসন্তোষ ছিল; কিন্তু শিক্ষার্থীরা কখনো শিক্ষকদের সঙ্গে সংঘাত জড়াতেন না। বিগত দেড় দশকের রাজনীতি এবং জুলাই অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি এখানে বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সেখানে ডাকসুর বিতর্কিত ভূমিকাও আমাদের দেখতে হলো।
ডাকসুর সংগ্রহশালা
এবারের ডাকসুর সবচেয়ে বিতর্কিত কার্যক্রম হলো ডাকসুর সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে আলোকিত করে রাখা এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনা করা। ইতিহাস বিকৃতি থেকে বাংলাদেশ যেন কোনোভাবেই বের হয়ে আসতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যাঁরা এখনো ইতিহাস নিয়ে লেখাপড়া করছেন; তাঁদের কে অধিকার দিল ডাকসুতে বিকৃত ইতিহাস সাজাতে?
এখানে যুক্ত করা হয়েছে শেখ মুজিবের বড় ছেলে শেখ কামালের বিয়ের ছবিও। ডাকসুর সংগ্রহশালায় সেই পারিবারিক ছবি সংগ্রহে রাখার উদ্দেশ্য কী? একজন সাংবাদিক ডাকসুর সংগ্রহশালার সমন্বয়কারীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শেখ মুজিবের ৭ মার্চ বা স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো ছবি কেন রাখা হয়নি? তাঁর উত্তর ছিল, ‘ইচ্ছে হয়নি, তাই।’ প্রশ্ন উঠতে পারে, তাঁর ইচ্ছামতেই কি বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা হবে?
ডাকসু নেতৃবৃন্দের জিন্নাহপ্রীতি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মেনে নেননি, তাঁরা ডাকসু সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ভাঙচুর করেন এবং একই স্থানে গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি ছবি টাঙিয়েছেন। কাউকে জুতাপেটার ছবি টাঙানোও ভালো সংস্কৃতি নয়। পুরা ব্যাপারটা সম্ভবত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এগুলো সবই ডাকসুর উজ্জ্বল স্মরণীয় ইতিহাস এবং তখনকার সময় ডাকসু কীভাবে সব শিক্ষার্থীর ঐক্যের প্রতীক ছিল, তার নিদর্শন। সেই তুলনায় ২০২৫-২৬ সালের ডাকসু ইতিহাসে নাম লেখাচ্ছে শিক্ষক হেনস্তা, শিক্ষক মূল্যায়ন, জিন্নাহপ্রীতি এবং জামায়াতের রাজনীতির প্রচারণা—এসব বিতর্কিত পদক্ষেপ দিয়ে।
ডাকসুর ঐতিহ্যকে এভাবে পদায়ন করা খুবই দুঃখজনক। এখনো হয়তো কিছু সময় আছে, বর্তমান ডাকসু নেতৃবৃন্দ কিছু কার্যক্রম নিতে পারেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের দলমত সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করবে।
