নিজস্ব প্রতিবেদক: ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হওয়া হামলার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই। কারও রাজনৈতিক অবস্থান অপছন্দ হলে তার জবাব রাজনৈতিকভাবেই দিতে হয়। বক্তব্যের জবাব বক্তব্যে, লেখার জবাব লেখায়, প্রতিবাদের জবাব পাল্টা প্রতিবাদে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক মতের জবাব ভোটে। গায়ে হাত তোলা সেখানে রাজনীতি নয়, সহিংসতা।
বাঁধনের ওপর হামলার পর ব্যাপক নিন্দা ও ক্ষোভ দেখা গেছে, যা জরুরি এবং প্রত্যাশিত। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়া একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে আনে: মব সহিংসতার বিরুদ্ধে এই নৈতিক স্পষ্টতা কি আমরা সব ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে সমানভাবে দেখাতে পেরেছি?
এই বিতর্কের কেন্দ্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম একটি সংজ্ঞাগত প্রশ্ন তুলেছেন। ‘মব’ ও ‘পলিটিক্যাল অ্যাটাক’ বিষয় দুটির মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “মব তখনই বলা হয়, যেটার কোনো পলিটিক্যাল ক্যারেক্টার নাই।” উদাহরণ হিসেবে তিনি হঠাৎ ক্ষুব্ধ মানুষের একত্র হয়ে কাউকে লিঞ্চিং করার কথা বলেছেন। অন্যদিকে বাঁধনের ওপর হামলাকে তিনি মব নয়, ‘পলিটিক্যাল অ্যাটাক’ হিসেবে মনে করেন; কারণ এর পেছনে একটি রাজনৈতিক দল ও তার কর্মীরা ছিল।
এর আগে ‘প্রেশার গ্রুপ’ শব্দটির ব্যাখ্যাতেও তার যুক্তি ছিল, কোনো গোষ্ঠী নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে এলে এবং তাদের পরিচয় জানা থাকলে তাদের মব বলা ঠিক নয়।
এই সংজ্ঞায়ন দুটি ভিন্ন প্রশ্নকে গুলিয়ে ফেলে: একটি গোষ্ঠীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আর তাদের আচরণের পদ্ধতি এক নয়। ‘প্রেশার গ্রুপ’ দিয়ে গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য বোঝায়, আর ‘মব’ প্রশ্ন তোলে তাদের আচরণের ধরন নিয়ে। সংগঠন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত বদলাতে চাওয়া আর সংখ্যার শক্তি, ভয় বা শারীরিক আক্রমণ দিয়ে কাউকে বাধ্য করার মধ্যে মূল তফাত। অর্থাৎ পলিটিক্যাল অ্যাটাক’ এবং মব অ্যাটাক সম্পূর্ণ আলাদা শ্রেণি নয়; একটি আক্রমণ একই সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মব সহিংসতা হতে পারে।
ধরা যাক, একদল শিক্ষার্থী মিছিল বা স্মারকলিপি দিয়ে উপাচার্যের পদত্যাগ চাইল—এটি রাজনৈতিক চাপ। কিন্তু তারা যদি উপাচার্যকে আটকে শারীরিক ক্ষতির ভয় দেখিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করে, তবে তা মব আচরণ। একইভাবে, কোনো গোষ্ঠী অনুষ্ঠান বাতিলের দাবি জানাতেই পারে; কিন্তু লোক জড়ো করে আয়োজকদের ভীতি সৃষ্টি করে অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য করলে তা আর মতপ্রকাশের মধ্যে থাকে না, সেখানে জবরদস্তির প্রশ্ন আসে।
গণতান্ত্রিক চাপ জনমত ও প্রতিবাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত বদলায়; মব ভয় ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত মানায়। তাই “মব তখনই বলা হয়, যেটার কোনো পলিটিক্যাল ক্যারেক্টার নাই”—কথাটি ইতিহাসে টেকে না। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলে প্রবেশ করা জনতার স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল; কিন্তু সেজন্য তাদের আচরণের ‘মব’ বৈশিষ্ট্য মুছে যায়নি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য মবের বিপরীত নয়, বরং অনেক সময় তা-ই মবকে সংগঠিত করে।
জেমস ম্যাডিসন ফেডারেলিস্ট নম্বর টেনে ফ্যাকশন নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, তা এমন গোষ্ঠীগত শক্তি নিয়ে, যা নিজেদের স্বার্থের প্রভাবে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। আধুনিক গণতন্ত্র এই শক্তিকে নিয়মের মধ্যে রাখে; কারণ সংখ্যার শক্তি নৈতিক বা আইনি বৈধতার প্রমাণ নয়।
শফিকুল আলমের যুক্তি ধরলেও আক্রমণকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় হামলার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু সংঘবদ্ধভাবে ঘিরে ধরা বা মারধর করার পদ্ধতিকে বদলে দেয় না। মব স্বতঃস্ফূর্ত বা সংগঠিত—উভয়ই হতে পারে। কেবল হঠাৎ ক্ষুব্ধ জনতাকে ‘মব’ বললে রাজনৈতিক মব সহিংসতার বড় ইতিহাসই বাদ পড়ে যায়।
বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই যদি আক্রমণ ‘পলিটিক্যাল অ্যাটাক’ হয়ে যায়, তবে বিচার পদ্ধতি আচরণভিত্তিক না হয়ে পরিচয়ভিত্তিক হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধানমন্ডি ৩২ ঘিরে সহিংসতা, মাজার ও ভাস্কর্যে হামলা বা নারীদের হেনস্তার প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও একটি সাধারণ নীতি বদলাতে পারে না: কোনো কাজের সংজ্ঞা আক্রমণকারী বা আক্রান্তের পরিচয় দেখে নির্ধারিত হতে পারে না।
আমাদের আচরণ বদলে যাচ্ছে কর্তার পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে। নিজের পক্ষ করলে ‘জনরোষ’ বা ‘প্রতিরোধ’, আর প্রতিপক্ষ করলে ‘মব’। ভাষাগত এই কারসাজি সহিংসতার সামাজিক অর্থ বদলে দেয় এবং জবরদস্তিকে রাজনৈতিক দরকষাকষির স্বাভাবিক ভাষা বানিয়ে ফেলে।
ম্যাক্স ওয়েবারের রাষ্ট্রচিন্তা অনুযায়ী, বৈধ শারীরিক বলপ্রয়োগের কর্তৃত্ব কেবল রাষ্ট্রের। সংঘবদ্ধ জনতা যদি ঠিক করতে শুরু করে কে কথা বলবে, কোন অনুষ্ঠান হবে বা কাকে শাস্তি দেওয়া হবে, তবে রাষ্ট্রের আইনি কর্তৃত্বের পাশে একটি অনানুষ্ঠানিক শাস্তিদাতা ক্ষমতা তৈরি হয়।
মব যদি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ভেটো করার ক্ষমতা পায়, তবে বার্তা যায়—যুক্তির চেয়ে ভয় বেশি কার্যকর। আইনের শাসন ঠিক এর বিপরীত নীতি দাবি করে: কাজের বিচার সবার জন্য একই মানদণ্ডে হতে হবে।
বাঁধনের জন্য দেখানো নৈতিক ক্ষোভ তোফাজ্জল, দীপু, রাজনৈতিক কর্মী, নারী বা সংখ্যালঘু—সবার জন্যই প্রযোজ্য হতে হবে। যাকে রাজনৈতিকভাবে অপছন্দ করি, তার ওপর অন্যায় হলেও একই ভাষায় প্রতিবাদ করাই গণতান্ত্রিক নৈতিকতার আসল পরীক্ষা। মবের কোনো গ্রহণযোগ্য সংস্করণ নেই।
Comments
Previous Article৯/১১’র সন্ত্রাসীদের প্রতি ঘৃণা ও ভিকটিমদের স্মরণ
