ফোরটিন ডেস্ক : ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভের মধ্যেই মব সহিংসতার সংজ্ঞা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারও রাজনৈতিক অবস্থান অপছন্দ হলে তার জবাব রাজনৈতিকভাবেই দেওয়া উচিত। বক্তব্যের জবাব বক্তব্যে, লেখার জবাব লেখায়, প্রতিবাদের জবাব পাল্টা প্রতিবাদে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক মতের জবাব ভোটে দেওয়াই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। গায়ে হাত তোলা সেখানে রাজনীতি নয়, সহিংসতা।
বাঁধনের ওপর হামলার পর ব্যাপক নিন্দা ও ক্ষোভ দেখা গেছে। তবে এই প্রতিক্রিয়া একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছে, মব সহিংসতার বিরুদ্ধে এই নৈতিক অবস্থান কি সব ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলমের একটি বক্তব্য। ‘মব’ এবং ‘পলিটিক্যাল অ্যাটাক’-এর মধ্যে পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “মব তখনই বলা হয়, যেটার কোনো পলিটিক্যাল ক্যারেক্টার নাই।” তার উদাহরণ ছিল, হঠাৎ ক্ষুব্ধ মানুষের একত্র হয়ে কাউকে লিঞ্চিং করার ঘটনা।
অন্যদিকে বাঁধনের ওপর হামলাকে তিনি মব নয়, ‘পলিটিক্যাল অ্যাটাক’ হিসেবে দেখেছেন। তার যুক্তি, হামলার পেছনে একটি রাজনৈতিক দল ও তার কর্মীরা ছিল।
এর আগে ‘প্রেশার গ্রুপ’ শব্দটির ব্যাখ্যাতেও তার যুক্তি ছিল, কোনো গোষ্ঠী নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে এলে এবং তাদের পরিচয় জানা থাকলে তাদের মব বলা ঠিক নয়।
তবে এই সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে একটি গোষ্ঠীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং তাদের আচরণের পদ্ধতি দুটি আলাদা বিষয়। ‘প্রেশার গ্রুপ’ দিয়ে একটি গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য বোঝানো হয়, আর ‘মব’ বলতে মূলত আচরণের ধরনকে বোঝানো হয়।
সংগঠিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি জানানো এবং সংখ্যার শক্তি, ভয় বা শারীরিক আক্রমণের মাধ্যমে কাউকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ফলে কোনো আক্রমণ একই সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মব সহিংসতাও হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, একদল শিক্ষার্থী মিছিল বা স্মারকলিপির মাধ্যমে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করলে সেটি রাজনৈতিক চাপের অংশ। কিন্তু তারা যদি উপাচার্যকে আটকে শারীরিক ক্ষতির ভয় দেখিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করে, তাহলে সেখানে মব আচরণ ও জবরদস্তির প্রশ্ন আসে।
একইভাবে কোনো গোষ্ঠী একটি অনুষ্ঠান বাতিলের দাবি জানাতে পারে। কিন্তু লোক জড়ো করে আয়োজকদের ভয় দেখিয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য করা হলে সেটিকে কেবল মতপ্রকাশের অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চাপ জনমত, আলোচনা ও প্রতিবাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চেষ্টা করে। বিপরীতে মব আচরণ ভয়, চাপ ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকা এবং মব হওয়ার বিষয়টি পরস্পরবিরোধী নয়।
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলে হামলার ঘটনাও এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেখানে অংশ নেওয়া জনতার স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার কারণে তাদের আচরণের মব বৈশিষ্ট্য বিলীন হয়ে যায়নি। বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অনেক সময় সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতাকেও সংগঠিত করতে পারে।
রাজনৈতিক দর্শনেও গোষ্ঠীগত শক্তি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। জেমস ম্যাডিসনের ফেডারেলিস্ট পেপারসের আলোচনায় ‘ফ্যাকশন’ নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল গোষ্ঠীগত স্বার্থের প্রভাবে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা। আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো এই ধরনের শক্তিকে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে রাখা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই যদি কোনো সংঘবদ্ধ হামলাকে শুধু ‘পলিটিক্যাল অ্যাটাক’ বলা হয়, তাহলে সহিংসতার বিচার আচরণভিত্তিক না হয়ে পরিচয়ভিত্তিক হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ধানমন্ডি ৩২ ঘিরে সহিংসতা, মাজার ও ভাস্কর্যে হামলা কিংবা নারীদের হেনস্তার মতো ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপট এক নয়। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ নীতি প্রযোজ্য হতে পারে, কোনো কাজের সংজ্ঞা হামলাকারী বা আক্রান্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
সমস্যা তৈরি হয় যখন একই ধরনের আচরণের জন্য পক্ষভেদে ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করা হয়। নিজের পক্ষের মানুষ একই কাজ করলে সেটি ‘জনরোষ’ বা ‘প্রতিরোধ’, আর প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে সেটি ‘মব’ হিসেবে চিহ্নিত হলে সহিংসতার সামাজিক অর্থ বদলে যায়। এর ফলে জবরদস্তি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দরকষাকষির স্বাভাবিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
ম্যাক্স ওয়েবারের রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনায় রাষ্ট্রের বৈধ কর্তৃত্ব এবং শারীরিক বলপ্রয়োগের বৈধতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সংঘবদ্ধ জনতা যদি নিজেরাই নির্ধারণ করতে শুরু করে কে কথা বলবে, কোন অনুষ্ঠান হবে কিংবা কাকে শাস্তি দেওয়া হবে, তাহলে রাষ্ট্রের আইনি কর্তৃত্বের পাশাপাশি একটি অনানুষ্ঠানিক শাস্তিদাতা ক্ষমতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মব যদি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার মতো ক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে একটি বিপজ্জনক বার্তা তৈরি হয়, যুক্তি ও আইন নয়, ভয় ও শক্তিই বেশি কার্যকর। অথচ আইনের শাসনের মৌলিক দাবি হলো, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয় নয়, কাজের ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতেই বিচার হবে।
তাই বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় যে নৈতিক ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে, একই নৈতিক মানদণ্ড তোফাজ্জল, দীপু, রাজনৈতিক কর্মী, নারী কিংবা সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন। যাকে রাজনৈতিকভাবে অপছন্দ করি, তার ওপর অন্যায় হলেও একই ভাষায় প্রতিবাদ করতে পারাই গণতান্ত্রিক নৈতিকতার বড় পরীক্ষা।
