ফোরটিন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি-আমেরিকান নতুন প্রজন্মের মধ্যে ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির মতো দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় পেশার পাশাপাশি আইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা সায়েন্স, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা হওয়ার মতো ক্ষেত্রও তরুণদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে।
কমিউনিটির কয়েকটি পরিবারের বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, পড়াশোনা বা কর্মজীবনের মাঝপথে অনেকে নিজেদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নতুন করে সাজাচ্ছেন।
টেক্সাসের বাংলাদেশি কমিউনিটির এক তরুণীর গল্প এর একটি উদাহরণ। মিডল স্কুল থেকেই তিনি হেলথ কেয়ার ও মেডিকেল সায়েন্স নিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। হাই স্কুল পেরিয়ে কলেজেও সেই লক্ষ্য ধরে পড়াশোনা করেছেন। তবে কলেজ শেষ করার পর তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায় পরিবর্তন এসেছে। এখন তিনি হেলথ কেয়ারের পরিবর্তে আইন পেশায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং ল স্কুলে ভর্তির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন।
অর্থাৎ কৈশোর থেকে যে ক্যারিয়ারের জন্য একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়েছেন, কলেজ শেষ করার পর নিজের আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনা করে সেই পথ পরিবর্তন করতেও দ্বিধা করছেন না।
জর্জিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও দেখা যাচ্ছে ভিন্ন ধরনের পরিবর্তন। এক বাংলাদেশি পরিবারের তরুণীর শুরু থেকেই তথ্যপ্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ ছিল। পড়াশোনার ক্ষেত্রেও আইটি ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ পছন্দ। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ এবং প্রযুক্তি খাতে কাজের ধরন পরিবর্তনের কারণে এখন তিনি নিজের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নতুনভাবে সাজাচ্ছেন।
আইটি পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে তিনি একই প্রযুক্তি খাতের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যারিয়ার গড়ার পরিকল্পনা করছেন। অর্থাৎ তার ক্ষেত্রে পরিবর্তনটি আইটি থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়, বরং আইটির মধ্যেই ভবিষ্যৎমুখী একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র বেছে নেওয়া।
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত আগ্রহ নয়, দ্রুত বদলে যাওয়া চাকরির বাজারও ভূমিকা রাখছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০২৫ সালের Future of Jobs Report অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চাকরির বাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব আরও বাড়বে। এআই ও বিগ ডেটা, নেটওয়ার্ক ও সাইবার সিকিউরিটি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে দ্রুত বাড়তে থাকা দক্ষতার মধ্যে রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বিগ ডেটা স্পেশালিস্ট, ফিনটেক ইঞ্জিনিয়ার, এআই ও মেশিন লার্নিং স্পেশালিস্ট এবং সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপারদের দ্রুত বাড়তে থাকা পেশার তালিকায় রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের হিসাবও দেখাচ্ছে, এআই প্রযুক্তির কারণে আইটি খাতের সব চাকরি কমে যাচ্ছে এমন নয়। বরং কিছু পেশায় কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ডেটা সায়েন্টিস্টের চাকরি ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ, ইনফরমেশন সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সফটওয়্যার ডেভেলপারের চাকরি ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
তবে প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে কিছু প্রচলিত কাজের ধরন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে প্রশ্নটি এখন শুধু আইটি পড়বে কি না, তা নয়। বরং আইটির কোন শাখায় গেলে ভবিষ্যতে বেশি সুযোগ তৈরি হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিবর্তন শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যে আইটি পেশায় কাজ করা কিছু বাংলাদেশি-আমেরিকান পেশাজীবীও চাকরির বাজারের পরিবর্তনের মধ্যে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। তাদের কেউ নতুন দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছেন, কেউ আইটির অন্য শাখায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, আবার কেউ চাকরির পরিবর্তে ব্যবসা ও উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে ঝুঁকছেন।
জর্জিয়ার এমনই এক তরুণ বাংলাদেশি আইটি পেশাজীবী, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি, দীর্ঘদিন আইটি খাতে কাজ করার পর এখন নতুন ব্যবসা শুরু করছেন। তার কাছে প্রযুক্তি খাতের দ্রুত পরিবর্তন এবং চাকরির অনিশ্চয়তা আইটি ক্যারিয়ারকে আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছে। ফলে চাকরির ওপর নির্ভর না করে নিজের ব্যবসা দাঁড় করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির আকারও দ্রুত বাড়ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভে বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের শুধু বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার।
২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ হাজার। ফলে কমিউনিটির একটি বড় অংশ এখন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বা দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম।
তাদের ক্যারিয়ার পছন্দ আগামী দিনের বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির পেশাগত পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একজন তরুণী হেলথ কেয়ার থেকে আইন পেশায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আরেকজন আইটি থেকে এআইভিত্তিক ক্যারিয়ারের দিকে এগোচ্ছেন। অন্যদিকে একজন অভিজ্ঞ আইটি পেশাজীবী চাকরির পরিবর্তে উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করছেন।
এই তিনটি ঘটনা পুরো কমিউনিটির চিত্র নয়। তবে এগুলো একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নতুন প্রজন্ম এখন শুধু বাবা-মায়ের পছন্দের পেশা নয়, বরং নিজের আগ্রহ, ভবিষ্যতের চাকরির বাজার, প্রযুক্তির পরিবর্তন, আয়ের সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বিবেচনা করে ক্যারিয়ার বেছে নিতে চাইছে।
বাংলাদেশি-আমেরিকান পরিবারগুলোর জন্য তাই ক্যারিয়ার নিয়ে পুরনো প্রশ্নটিও ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। প্রশ্নটি আর শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার নাকি আইটি, এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং কোন পেশায় ভবিষ্যতের সুযোগ বেশি, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়বে এবং সন্তানের নিজের আগ্রহ কোথায়, সেটিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আর এই পরিবর্তনের ধারাই হয়তো আগামী দিনে বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির নতুন ক্যারিয়ার মানচিত্র তৈরি করবে।
