ফোরটিন ডেস্ক : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর মুহূর্তের মধ্যেই পাল্টে যায় বাংলাদেশের পুরো সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দৃশ্যপট। দীর্ঘ একদলীয় শাসন, দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি দেশ রাতারাতি প্রবেশ করে নজিরবিহীন সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও গভীর অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায়ে।
১৫ আগস্ট সকালে রেডিওতে শেখ মুজিবের মৃত্যুর সংবাদ প্রচারের পরপরই দেশজুড়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্ফিউ জারি করা হয়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে থমথমে স্তব্ধতা ও গভীর আতঙ্ক নেমে আসে। শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরই সতীর্থ ও তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং খন্দকার মোশতাকের নতুন মন্ত্রিসভায় তৎকালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই শপথ গ্রহণ করেন।
১৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সার্বিক চিত্র নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো –
- প্রশাসনিক ও সামাজিক স্তব্ধতা: অভ্যুত্থানের পর পুরো দেশ সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। রাস্তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বেশ কয়েক দিনের জন্য থমকে দাঁড়ায়। কোথাও বড় ধরনের কোনো তাৎক্ষণিক জনবিক্ষোভ না হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল গভীর ভয় ও অনিশ্চয়তা।
- একদলীয় ব্যবস্থার অবসান ও সংবিধান স্থগিত: খন্দকার মোশতাক আহমেদ দায়িত্ব নিয়েই দেশে জারি থাকা ‘বাকশাল’ ব্যবস্থা অকার্যকর করে দেন এবং দেশে সামরিক আইন (মার্শাল ল) জারি করেন। জাতীয় সংসদ বহাল রাখা হলেও সংবিধানের মূল ধারাগুলো স্থগিত করা হয়।
- সেনাবাহিনীতে উপদলীয় কোন্দল: ১৫ আগস্টের ঘটনা সেনাবাহিনীতে একটি স্থায়ী বিশৃঙ্খলা ও ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করে। জুনিয়র অফিসারদের ক্ষমতা দাপানো এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার কারণে সেনাবাহিনীতে তীব্র অসন্তোষ ও অস্থিরতা দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।
- আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেপ্তার ও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের চার জাতীয় নেতাসহ (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান) শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বরের ২৬ তারিখে মোশতাক সরকার ১৫ আগস্টের ঘাতকদের বিচার থেকে রক্ষা করতে বিতর্কিত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করে।
- আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও স্বীকৃতি: শেখ মুজিবের মৃত্যুর পরপরই পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং চীনসহ যেসব দেশ বাংলাদেশকে কৌশলগত স্বীকৃতি দিতে বিলম্ব করছিল, তারা নতুন খন্দকার মোশতাক সরকারকে দ্রুত স্বীকৃতি দেয়। এতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় ধরনের মেরুকরণ স্পষ্ট হয়।
সার্বিকভাবে, ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ এক ঘোরতর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামরিক প্রভাবের যুগে প্রবেশ করে, যার রেশ ধরে পরবর্তীতে দেশে একের পর এক সিপাহী বিপ্লব, জেলহত্যা ও সামরিক শাসনের ধারা দীর্ঘায়িত হয়।
