বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) চলা মামলা পরিচালনার ধরন, তদন্তের দুর্বলতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নানা ঘাটতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, নিরপেক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না মেনে বিচার কার্যক্রম চালানো হলে তা ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
গত বুধবার (২৯ জুলাই, ২০২৬) যুক্তরাজ্য লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ এই তথ্য জানায়।
বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ও জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু দুর্বল তদন্ত ও ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার সুযোগ নতুন সরকারের দেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার জরুরি সংস্কার এখন সময়ের দাবি।”
এইচআরডব্লিউ জানায়, ট্রাইব্যুনালের এক ডজনেরও বেশি মামলা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন-পরবর্তী ৬টি সমাপ্ত মামলার নথি পর্যবেক্ষণ করে তারা বেশ কিছু গুরুতর অসঙ্গতি পেয়েছেন। যার মধ্যে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই আসামিদের দীর্ঘ সময় আটক রাখা, অভিযোগ গঠনের নির্দিষ্ট কারণ না জানানো, আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং আইনজীবীদের ওপর কড়াকড়ি আরোপের বিষয়টি উঠে এসেছে।
সংস্থাটি আরও উল্লেখ করে, শেখ হাসিনাসহ ৬২ জন দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির মধ্যে ৪২ জনের বিচার করা হয়েছে অনুপস্থিতিতে এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত ২৭ জুলাই ৪১ জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা নতুন অভিযোগপত্রে রাজনীতিকদের পাশাপাশি দুই সাংবাদিকের (মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপা) নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার জন্য যে সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী ধ্বংসের উপাদান থাকা প্রয়োজন, তা সংবাদকর্মীদের ক্ষেত্রে কতটুকু প্রযোজ্য—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
এছাড়া চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চলের মামলায় একাধিক সাক্ষ্যের বিবরণী হুবহু ‘একই ভাষায়’ (টেমপ্লেট স্টাইলে) লেখা হওয়া এবং প্রসিকিউশনের এক সদস্যের বিরুদ্ধে ১ কোটি টাকার ঘুষ কেলেঙ্কারির অডিও ফাঁস হওয়ার ঘটনাটি তুলে ধরে এইচআরডব্লিউ বলেছে, এতে প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রসিকিউশনের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
১৯৭১ সালের অপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে ২০১০ সালেও এই ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিল উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, আইনি সংশোধন করা হলেও বর্তমান কাঠামো এখনো আন্তর্জাতিক ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ বা ন্যায্য বিচারের মানদণ্ড পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। তাই বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এইচআরডব্লিউ বলে, গুরুতর অপরাধের বিচার যেন কোনো বিতর্ক ছাড়া সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়।
সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
