২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এক যুগে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছিল। দারিদ্র্য কমানো, বিদ্যুৎ সুবিধার বিস্তার, শিক্ষা ও স্যানিটেশনে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ এবং নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল।
এই সময়ের বড় একটি অংশে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন শেখ হাসিনা সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিল। ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের Bangladesh Poverty and Equity Assessment প্রতিবেদনে ২০১০ থেকে ২০২২ সালের বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল, তাতে এই সময়ের অগ্রগতির একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক মূল্যায়ন পাওয়া যায়।
৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য থেকে বের হয়েছিল । বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য থেকে বের হয়েছিল।
কমেছিল চরম ও মধ্যম দারিদ্র্যঃ ২০১০ সালে বাংলাদেশের extreme poverty বা চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ১২.২ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে ৫.৬ শতাংশে নেমেছিল।
একই সময়ে moderate poverty বা মধ্যম দারিদ্র্যের হার ৩৭.১ শতাংশ থেকে কমে ১৮.৭ শতাংশে নেমেছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে এবং প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ মধ্যম দারিদ্র্য থেকে বের হয়েছিল।
অর্থাৎ শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালের এই ১২ বছরে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল।
বিদ্যুৎ পৌঁছেছিল ঘরে ঘরেঃ এই সময়ের অন্যতম দৃশ্যমান পরিবর্তন ছিল বিদ্যুৎ সুবিধার ব্যাপক সম্প্রসারণ। ২০১০ সালের তুলনায় ২০২২ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ সুবিধা দেশের মানুষের কাছে অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছিল।
বিদ্যুতের বিস্তার শুধু ঘরে আলো পৌঁছানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি শিক্ষার সুযোগ, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক ২০১০-২০২২ সময়ের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিদ্যুৎ সুবিধার বিস্তারকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
মেয়েদের শিক্ষায় বড় অগ্রগতিঃ শিক্ষাক্ষেত্রেও এই সময়ে বাংলাদেশের বড় পরিবর্তন ঘটেছিল। বিশেষ করে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষায় gender parity অর্জন করেছিল। অর্থাৎ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের অংশগ্রহণের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছিল এবং এক পর্যায়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি হয়েছিল।
মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের এই অগ্রগতি বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছিল।
শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছিলঃ এই সময় বাংলাদেশে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পেয়েছিল। তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, সেবা খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে।
২০২২ সালের Household Income and Expenditure Survey-এর তথ্য অনুযায়ী, সে বছর বাংলাদেশের নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪২.৫ শতাংশ ছিল। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৮১.৩ শতাংশ।
যদিও নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে ব্যবধান তখনও ছিল, তবু আগের দশকের তুলনায় নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছিল।
স্যানিটেশন ও মৌলিক সেবায় উন্নতিঃ ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকারও বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্যানিটেশনের মতো মৌলিক সুবিধার বিস্তার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিল।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়নেও ২০১০-২০২২ সময়ের দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে এসব মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকারের উন্নতির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছিল।
অবকাঠামোতেও হয়েছিল দৃশ্যমান পরিবর্তনঃ এই সময় বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল। ২০১০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের মধ্যে পদ্মা সেতু ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
২০২২ সালে পদ্মা সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ আরও সরাসরি হয়েছিল। একই সময় ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্পও বাস্তবায়নের পর্যায়ে এগিয়ে গিয়েছিল।
এসব প্রকল্পের মাধ্যমে যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কমেছিল দারিদ্র্যঃ ২০১০ থেকে ২০২২ সালের সময়কালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, এই সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছিল এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
ফলে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাস, বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, শিক্ষা, স্যানিটেশন, নারীর অংশগ্রহণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে একাধিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক তথ্যেও উঠে এসেছিল বাংলাদেশের অগ্রগতি
২০১০ থেকে ২০২২ সালের এই পরিবর্তনগুলো শুধু দেশের সরকারি পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার মূল্যায়নেও বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাস এবং মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকারের উন্নতি উঠে এসেছিল।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এই ১২ বছরে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য থেকে বের হয়েছিল, চরম দারিদ্র্যের হার অর্ধেকেরও বেশি কমেছিল এবং মধ্যম দারিদ্র্যের হার প্রায় অর্ধেকে নেমেছিল। একই সময়ে বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্যানিটেশনে মানুষের প্রবেশাধিকারও বেড়েছিল।
২০১০ থেকে ২০২২ সালের এই পরিসংখ্যানগুলো দেখিয়েছিল, শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছিল। দারিদ্র্য হ্রাস থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, শিক্ষা, নারীর অংশগ্রহণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, একাধিক সূচকেই সেই সময়ের পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া গিয়েছিল।
