নিজস্ব প্রতিবেদন : টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়ে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জেলার কয়েক লাখ মানুষ এখন পানিবন্দী অবস্থায় আশ্রয়কেন্দ্র ও নিজ গৃহের ছাদে চরম মানবিক বিপর্যয় পার করছেন। এমন পরিস্থিতিতে উপদ্রুত এলাকার বন্যার্তদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যে জরুরি সাহায্য ও ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তার পরিমাণ নিয়ে মাঠপর্যায়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। হিসাব করে দেখা গেছে, রাঙামাটির বানভাসি মানুষের জন্য সরকারি বরাদ্দ মাথাপিছু মাত্র ৩২ টাকা এবং ওজনে মাত্র ২৭০ গ্রাম চাল। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের এই চরম সংকটে এমন নামমাত্র বরাদ্দকে ‘বানভাসি মানুষের সাথে তামাশা’ বলে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অধিকারকর্মীরা।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি, লংগদু, জুরাছড়ি, বরকলসহ প্রায় ১০টি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, জেলা জুড়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখেরও বেশি মানুষ সরাসরি এই আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দী হয়েছেন। অথচ এই বিপুল সংখ্যক দুর্গত মানুষের জন্য সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে জরুরি ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ৯৫ মেট্রিক টন চাল। এই মোট বরাদ্দকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যার অনুপাতে বণ্টন করলে দেখা যায়, একজন বন্যার্ত মানুষের ভাগ্যে জুটছে মাত্র ৩২ টাকা এবং ২৫০ থেকে ২৭০ গ্রাম চাল, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে এক বেলার আহার সংস্থান করাও অসম্ভব।
মাঠপর্যায়ের বানভাসি মানুষরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেছে, রান্নার কোনো উপায় নেই। চরের এবং দুর্গম পাহাড়ের মানুষরা শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার করছেন। বাঘাইছড়ির এক বাসিন্দা জানান, “সরকার থেকে নাকি ত্রাণ এসেছে। কিন্তু আমরা যা পাচ্ছি, তা দিয়ে এক বেলাও চলে না। চাল পেলেও তা ফুটিয়ে খাওয়ার মতো লাকড়ি বা শুকনো জায়গা আমাদের নেই। এই ৩২ টাকা দিয়ে বাজারে এখন এক হালি ডিমও পাওয়া যায় না।” স্থানীয় ইউপি সদস্যরাও স্বীকার করেছেন যে, বরাদ্দের পরিমাণ এতটাই কম যে তা মানুষের হাতে তুলে দিতে গিয়ে তারা নিজেরাই লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়ছেন।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক অবশ্য জানিয়েছেন, এই বরাদ্দটি কেবল প্রাথমিক এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দেওয়া হয়েছে। দুর্গম অঞ্চলের কারণে অনেক জায়গায় ত্রাণ পৌঁছাতে সময় লাগছে এবং সরকার আরও বড় আকারের ত্রাণ প্যাকেজ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে স্থানীয় সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে এখানে পরিবহন খরচই অনেক বেশি। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের পর এই আকস্মিক বন্যা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। এই অবস্থায় সরকারি সাহায্য যদি দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বৃদ্ধি না করা হয়, তবে উপদ্রুত পাহাড়ি এলাকায় তীব্র খাদ্য সংকট ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
