নিজস্ব প্রতিবেদন : যুক্তরাষ্ট্রের মেইন অঙ্গরাজ্যে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই)-এর এক বিতর্কিত অভিযানে ২৬ বছর বয়সী এক কলম্বিয়ান নাগরিক গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিহত তরুণকে তাদের অভিযানের মূল লক্ষ্যবস্তু দাবি করলেও, পরবর্তীতে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছেন যে—নিহত ব্যক্তি আসলে ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিলেনই না। চোখের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যার এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটেছে তার মাত্র ৩ বছর বয়সী অবুঝ কন্যাসন্তানের সামনে।
স্থানীয় ও ফেডারেল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত সোমবার সকালে মেইনের বিডেফোর্ড শহরে চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ প্রাপ্ত এক অভিবাসীকে ধরতে নজরদারি চালাচ্ছিল আইসিই। সংস্থাটির দাবি, একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা থেকে একটি গাড়ি বের হলে কর্মকর্তারা সেটিকে থামানোর চেষ্টা করেন। এ সময় গাড়িটি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং এক কর্মকর্তার দিকে ধেয়ে আসে। জননিরাপত্তার আশঙ্কায় এক আইসিই কর্মকর্তা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালান, যাতে গাড়িচালক ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। মেইনের অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যারন ফ্রে জানান, গুলিবর্ষণকারী কর্মকর্তা আইসিইর ‘এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড রিমুভাল অপারেশনস’ বিভাগের সদস্য। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে সাময়িক প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের (ডিএইচএস) ইন্সপেক্টর জেনারেলের দপ্তর।
তদন্তকারীরা শুরুতে নিহতের পরিচয় প্রকাশ না করলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রতিবেশী ও পরবর্তীতে কলম্বিয়ার দূতাবাস নিশ্চিত করেছে যে নিহত যুবকের নাম জোয়ান সেবাস্তিয়ান গুয়েরেরো (২৬)। তিনি স্ত্রী ও তিন বছর বয়সী কন্যাসন্তানকে নিয়ে বিডেফোর্ডে বসবাস করতেন। কলম্বিয়া দূতাবাস ইতিমধ্যে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়েছে। স্থানীয় কংগ্রেসওম্যান চেলি পিংরি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “একটি তিন বছরের শিশু এখন তার বাবাকে আর কখনো দেখতে পাবে না।”
ঘটনার পর বিডেফোর্ডে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শী মেরি হেইস বলেন, তিনি নিহত ব্যক্তির স্ত্রীর সামনে স্বামীর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন। একই সঙ্গে ছোট্ট মেয়েটিকেও কাঁদতে দেখেছেন, যে আর কখনো তার বাবাকে ফিরে পাবে না। মেইনের সিনেটর অ্যাঙ্গাস কিং জানান, প্রথমে তাঁকে আইসিই’র পক্ষ থেকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তবে কয়েক ঘণ্টা পর ডিএইচএসের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মার্কওয়েইন মুলিন ফোন করে স্বীকার করেন যে নিহত ব্যক্তি আসলে অভিযানের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলেন না। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের শরীরে কোনো বডি ক্যামেরা ছিল না, ফলে এই প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। মেইনের গভর্নর জ্যানেট মিলস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার যে ব্যক্তিকে খুঁজছিলই না, তার মৃত্যু ঘটনাটিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এটি অভিবাসন অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুতর অব্যবস্থাপনা ও চরম বেপরোয়া আচরণের ইঙ্গিত দেয়।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যার মাত্র এক সপ্তাহ আগে টেক্সাসের হিউস্টনে আইসিইর আরেকটি তথাকথিত ভুল অভিযানে ৫২ বছর বয়সী মেক্সিকান নির্মাণশ্রমিক লরেঞ্জো সালগাদো আরাউহো গুলিতে নিহত হন। সেখানেও ফেডারেল কর্তৃপক্ষ পরে স্বীকার করেছিল যে নিহত ব্যক্তি অভিযানের লক্ষ্য ছিলেন না। একের পর এক এমন ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আইসিইর বলপ্রয়োগের কৌশল, চরম অসচেতনতা এবং অভিবাসন আইন বাস্তবায়নের নিষ্ঠুর পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র আন্দোলনের মুখে পড়েছে বাইডেন প্রশাসন।
