নিজস্ব প্রতিনিধি : রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে উগ্রবাদী সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস)-এর প্রধান শাহ আমানত সাবির ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ বা ভারতীয় উপমহাদেশের চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বোমা তৈরি ও বিস্ফোরণের চর্চা করছিলেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন. তবে গ্রেপ্তারকৃত ছয়জনের সঙ্গে এখন পর্যন্ত দেশি বা আন্তর্জাতিক কোনো মূলধারার জঙ্গি সংগঠনের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ বা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের প্রমাণ মেলেনি. তিন দিনের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এই তথ্য জানিয়েছে.
এর আগে, গত রোববার ভোররাতে যাত্রাবাড়ীর ‘মিনি কক্সবাজার’ এলাকা থেকে উগ্রবাদী সন্দেহে খুলনাভিত্তিক মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এফসিএস-এর শিক্ষক ও ছাত্রসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়. প্রথম দফায় তিন দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার প্রধান অভিযুক্ত শাহ আমানত সাবির ও তাঁর সহযোগী হোসাইন তানিমকে পুনরায় তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত; বাকি চারজনকে পাঠানো হয়েছে কারাগারে. এই চারজনের মধ্যে আতাউল্লাহ শাহ নামের একজন গাজীপুর মহানগর এনসিপির নেতা ছিলেন, যাঁকে উগ্রবাদের অভিযোগে ইতিমধ্যেই দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে. সিটিটিসি জানায়, বাকি চারজন মূলত ফেসবুকে দেখে সাবিরের কাছে কেবলই মার্শাল আর্ট শিখতে এসেছিলেন, উগ্রবাদে তাঁদের কোনো সম্পৃক্ততা মেলেনি.
জিজ্ঞাসাবাদে সাবির জানিয়েছেন, পটকা বা চকলেট বোমার উপকরণ দিয়ে তিনি বোমা বানানো শিখছিলেন. সম্প্রতি প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন শায়ের সামি ফেসবুকে সাবিরের বোমা বিস্ফোরণের একটি ভিডিও প্রকাশ করলে তা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে. ভিডিওতে সাবিরকে একটি নির্জন রাস্তায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ তাকবীর দিতে এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর নাশিদ বাজাতে দেখা যায়. ভিডিওতে সাবিরকে বলতে শোনা যায়, “হে কুফররা তোমরা তৈরি থাকো… ইউনূস তুই তৈরি থাক”. তবে সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওটা কোনো পেশাদার আইইডি (IED) বা শক্তিশালী বোমা ছিল না; মূলত চকলেট বোমার উপকরণের সঙ্গে পেট্রোল মিশিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর খুলনার ডুমুরিয়ার এক নির্জন সড়কে তারা এটি ফুটিয়েছিল. ভিডিওতে নিজেদের ক্ষমতা ও পারঙ্গমতা জাহির করতে পরে এডিটিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম ‘বুম’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছিল.
তদন্তে আরও জানা গেছে, এই চক্রটি সংগঠন চালানোর অর্থ জোগাড় করতে খুলনা ও যশোরে ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের পথ বেছে নিয়েছিল. সাবির স্বীকার করেছেন, খুলনায় একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী ইজিবাইক চালককে ‘বিধর্মী ও হিন্দুত্ববাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁরা ছিনতাই করেন, যাতে ধর্মীয় দৃষ্টিতে একে ‘জুলুম’ মনে না হয় এবং সংগঠনের তহবিলও ভারী হয়. এছাড়া ‘ম্যাক ইউরি’ নামক বা ছদ্মনামের এক রহস্যময় প্রশিক্ষকের কাছ থেকে তারা মার্শাল আর্টের দীক্ষা নিয়েছিল, যার খোঁজে পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে.
এদিকে সাবির গ্রেপ্তার হওয়ার পর অনলাইনে আতাউর রহমান বিক্রমপুরী ও আসিফ আদনানের মতো আলোচিত ধর্মীয় বক্তারা তাঁর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হলেও, মঙ্গলবার রাতে বোমা বিস্ফোরণের ভিডিওটি ফাঁসের পর তাঁরা দ্রুত নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলেছেন. আসিফ আদনান তাঁর পোস্ট ডিলিট করে ভুল স্বীকার করেছেন এবং আতাউর রহমান বিক্রমপুরী সাবিরকে বিস্ফোরক আইনের আওতায় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন. বিক্রমপুরীর ফেসবুক পোস্টের কমেন্টে সাবিরের শ্বশুর আতিয়ার রহমান ঈমান ভঙ্গের ফতোয়া দিলে জবাবে বিক্রমপুরী পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, “আপনার মেয়ে জামাই সাবির মুসলিম, নাকি ‘র’ (RAW)-এর এজেন্ট—সেটা আগে পরিষ্কার করুন”. সিটিটিসির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, আলোচিত বক্তা বিক্রমপুরীর সঙ্গে সাবিরের নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়টি ক্রসচেক করা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষে দ্রুতই বিস্তারিত জানানো হবে.
