নিজস্ব প্রতিনিধি : ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং দ্বিপাক্ষিক নানাবিধ চুক্তি নিয়ে সমালোচনা করা হলেও, বাস্তবে প্রতিবেশী দেশটির সাথে বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা আগের চেয়ে আরও বেগবান হয়েছে। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের সাথে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তিকে একসময় ‘দেশের স্বার্থবিরোধী’ বা ‘গোলামির চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে অপপ্রচারের চেষ্টা চালানো হলেও, পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যাপক পর্যালোচনার পরেও সেসব চুক্তিতে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার মতো কোনো উপাদানের সন্ধান মেলেনি। উপরন্তু সরকার-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষ এই চুক্তিগুলোকে বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক লাভজনক হিসেবে বর্ণনা করায় চুক্তি বাতিলের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
এরই ধারাবাহিকতায়, শেখ হাসিনা সরকারের সময় আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে চূড়ান্ত হওয়া ভারতীয় রেল সংস্থার কাছ থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ আমদানির চুক্তিটি এখন বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে বর্তমান বিএনপি সরকার। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কেটে এই প্রকল্পের আওতায় প্রথম দফায় শিগগিরই যাত্রীবাহী কোচ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি জুলাই মাসেই এই হস্তান্তর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে।
গত ৯ই এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস মোল্লার এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এই আমদানির তথ্যটি নিশ্চিত করেন। মন্ত্রী জানান, ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) অর্থায়নে ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ কোচ সরবরাহের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বর্তমানে পুরোদমে চলমান রয়েছে। এই মেগা প্রকল্পের আওতায় ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে সকল কোচ বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ বিষয়ে ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির রেল মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ রাষ্ট্রীয় সংস্থা রাইটস (RITES)-এর মাধ্যমে প্রায় ৯১৫ কোটি টাকার এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়েকে এসব যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহ করা হচ্ছে। যার মধ্যে প্রথম চালানে বাংলাদেশে পাঠানো হবে ২০টি কোচ। বর্তমানে পাঞ্জাবের কাপুরথলা রেল কোচ কারখানায় এই কোচগুলো তৈরি হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে তা হস্তান্তরের সার্বিক প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে। এর আগে ভারত বাংলাদেশকে ১২০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ, ৩৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ এবং ১০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সরবরাহ করেছিল।
বৈদেশিক বাণিজ্য ও কূটনীতি সংশ্লিষ্টদের মতে, এই চালানটি শুধু একটি সাধারণ বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর এটিই হতে যাচ্ছে ভারতের পক্ষ থেকে প্রথম কোনো বড় ধরনের সরবরাহ, যা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ২০২৪ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে সকল শর্ত পূরণ করে রাইটস এই কাজ পেয়েছিল। যদিও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার কারণে মাঝখানে কিছুটা সময় লেগেছিল, তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় সরবরাহ কার্যক্রমে গতি এসেছে।
নতুন এই চুক্তির আওতায় শুধু কোচ সরবরাহ নয়, এর পাশাপাশি উন্নত নকশা সহায়তা, খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ, রেলকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং কমিশনিং সেবাও প্রদান করা হবে। প্রকল্পটিতে ৩৬ মাসব্যাপী সরবরাহ কার্যক্রমের পাশাপাশি পরবর্তী ২৪ মাসের জন্য বিশেষ ওয়ারেন্টি সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভারতের রেল খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও লোকোপাইলট সীমান্ত হাজরা এবং রেল যন্ত্রাংশ বিশেষজ্ঞ দেবাশিস দে মনে করেন, এই নতুন চালানের মাধ্যমে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে এবং দুই দেশের পারস্পরিক উন্নয়ন অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী রূপ নেবে।
