নিজস্ব প্রতিনিধি : জুলাই অভ্যুত্থানে আহত দাবি করে জমা পড়া নতুন আবেদনগুলোর যাচাই-বাছাইয়ে নজিরবিহীন জালিয়াতি ও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। দুই শীর্ষ তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কঠোর তদন্তে প্রায় ২০০টি আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৬০০টি আবেদনে মারাত্মক তথ্যগত অসংগতি, একই ব্যক্তির একাধিক জালিয়াতিপূর্ণ আবেদন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মৃত বা শহীদের নামেও ‘আহত’ হিসেবে আবেদন করার মতো জঘন্য অনিয়ম ধরা পড়েছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে প্রকাশিত গেজেটের কিছু নাম নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় ১৩ জন মৃত এবং ২১৯ জন আহত ব্যক্তির নাম তালিকা থেকে বাতিল করা হয়েছিল। নতুন করে যেন কোনো ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি না হয়, সে জন্য এবার অত্যন্ত কঠোরভাবে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে আবেদনকারীদের মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় গেজেট প্রকাশের পর নতুন করে আরও ৩ হাজার ৩১৬টি আবেদন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ৩৮৮টি আবেদন সরাসরি চূড়ান্ত তদন্তের জন্য এসবি ও পিবিআই-এর কাছে পাঠানো হয়। দুই সংস্থার চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে ১ হাজার ৫৯০ জন আবেদনকারীর তথ্যের শতভাগ সত্যতা মিলেছে। প্রকৃত এই জুলাইযোদ্ধাদের নাম দ্রুততম সময়ের মধ্যে গেজেটভুক্ত করার আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে এদের মধ্যে ৭৮৯ জনকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, ভুয়া ও বাতিল হওয়া আবেদনকারীরা মূলত আন্দোলনে আহত হওয়ার পক্ষে কোনো ধরনের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা হাসপাতাল-ক্লিনিকের চিকিৎসার নথি উপস্থাপন করতে পারেননি। অনেকের দেওয়া ছবি কিংবা ঘটনাস্থলের বিবরণ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অসত্য প্রমাণিত হয়েছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ ও দুঃখজনক বিষয় হলো, অভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গ করা একজন মৃত ব্যক্তির নাম ব্যবহার করেও ‘আহত’ ক্যাটেগরিতে ভুয়া ভাতার সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে একটি চক্র। মন্ত্রণালয় ধারণা করছে, তথ্যগত ত্রুটি থাকা ৬০০ আবেদনের মধ্যে সর্বোচ্চ আরও ১০০টির মতো সত্যতা মিলতে পারে, বাকিগুলো পুরোপুরি বাতিল হবে।
বর্তমানে দেশে তিনটি পৃথক ক্যাটেগরিতে গেজেটভুক্ত আহত জুলাইযোদ্ধার সংখ্যা মোট ১৪ হাজার ৩৭০ জন। নতুন সত্যতা পাওয়া ১ হাজার ৫৯০ জন যুক্ত হলে এই মোট সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়াবে ১৫ হাজার ৯৬০ জনে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত মোট ৮৪৩ জন মৃত বা শহীদের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, মৃতদের পরিবারের জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকা, মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা এবং বিশেষ আবাসন সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে আহতদের আঘাতের শ্রেণিভেদে এককালীন আর্থিক সহায়তা, মাসিক ভাতা এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেন এই কঠোর পদক্ষেপের বিষয়ে বলেন, “প্রকৃত আহত ব্যক্তিরাই যেন জুলাইযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান ও স্বীকৃতি পান, সেটি নিশ্চিত করতে প্রতিটি আবেদন কঠোরভাবে স্ক্রিনিং করা হয়েছে। কোনো ভুয়া বা সুবিধাবাদী ব্যক্তি যেন এই তালিকায় ঢুকতে না পারেন, আমরা তা শতভাগ নিশ্চিত করছি।”
বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, “যাচাই-বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। শুধু এবং শুধুমাত্র প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদেরই গেজেটভুক্ত করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই পবিত্র তালিকা নিয়ে কেউ কখনো কোনো প্রশ্ন তোলার বা বিতর্ক করার সুযোগ না পায়।”
