নিজস্ব প্রতিনিধি : প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের ঝরে পড়া রোধ, ক্লাসে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং পুষ্টি নিশ্চিত করার মহৎ উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া পাঁচ হাজার ৪৫২ কোটি টাকার ‘স্কুল ফিডিং’ প্রকল্পে চরম বিশৃঙ্খলা ও হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। দেশের নির্বাচিত ১৫০টি উপজেলার ৩১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য নেওয়া এই মেগা প্রকল্পে কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই শত শত স্কুলে খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও ওজনে কম, কোথাও বাসি ও পচা কলা-রুটি-ডিম সরবরাহ করা হচ্ছে, যা খেয়ে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে। অথচ দরপত্রের স্পষ্ট শর্ত ভেঙে এই নজিরবিহীন জালিয়াতি করা হলেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, বিভিন্ন উপজেলা থেকে পাঠানো তথ্যে দেখা গেছে, খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সমতা ট্রেডার্স’ সবচেয়ে বেশি অনিয়ম করছে। প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ ১০টি জেলায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার খাবার সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছে। অনিয়মের চিত্র এতটাই ভয়াবহ যে, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ১৭৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টানা এক মাস ধরে সম্পূর্ণ খাবার সরবরাহ বন্ধ রেখেছে তারা। আর নেত্রকোনা সদর উপজেলায় চাহিদার মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ খাবার পাঠানো হয়েছে।
গত ২২ জুন নেত্রকোনা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি দাপ্তরিক চিঠিতে এই হরিলুটের খতিয়ান তুলে ধরা হয়। চিঠিতে বলা হয়, গত ৭ থেকে ২১ জুন পর্যন্ত ১৩ কার্যদিবসে ওই উপজেলায় ২ লাখ ৭৮ হাজার ৩৭৭টি বনরুটি সরবরাহের কথা থাকলেও সমতা ট্রেডার্স দিয়েছে মাত্র ২৮ হাজার ৯৮৭টি। একইভাবে ২ লাখ২৭ হাজার ৭৬৩টি ডিমের জায়গায় মাত্র ১৬ হাজার ৫৯টি, এবং ৫০ হাজার কলার বিপরীতে মাত্র ৫ হাজারটি সরবরাহ করা হয়েছে।
এদিকে মাদারীপুর পৌরসভা এলাকায় সমতা ট্রেডার্সের সরবরাহ করা পচা ডিম ও বাসি পাউরুটি খেয়ে বেশ কয়েকজন কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাদী হয়ে মামলা করলে পুলিশ সমতা ট্রেডার্সের দুই অপারেশনস ম্যানেজার—এ এফ এম আহসানুল হাবিব ও মো. নুরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে। নওপাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানান, খাবার না আসায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং দিন দিন ক্লাসে উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সমতা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী রেজাউল আলম খান বলেন, “একসাথে এত বিপুল পরিমাণ খাবার তৈরির মতো মানসম্মত বেকারি বা কারখানা পাওয়া কষ্টকর। চুক্তিবদ্ধ কারখানাগুলো ঠিকমতো সাপ্লাই দিতে না পারায় ময়মনসিংহ বেল্টে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। তবে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে মামলা দেওয়া হয়েছে।”
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কোনো স্কুলে যদি মানহীন খাবার দেওয়া হয় বা খাবার না পৌঁছায়, তবে আমরা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সব ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেব। শিশুদের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।” তবে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন দাবি করেন, খাবার কম পৌঁছানোর সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রথমে তাদের কাছে ছিল না, তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রথমে কারণ দর্শানো এবং পরে কার্যাদেশ বাতিল করা হবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৭ সাল পর্যন্ত মেয়াদী এই প্রকল্পে এরই মধ্যে ২ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সপ্তাহে ৫ দিন ফর্টিফাইড বিস্কুট, ডিম, কলা ও ইউএইচটি দুধ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো তা পুরোপুরি লঙ্ঘন করছে। নিয়ম অনুযায়ী অবিলম্বে সমতা ট্রেডার্সের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত হলেও মন্ত্রণালয় কেবল ‘তদন্ত কমিটি’ গঠনের মাঝেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখছে, যা পুরো প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে ভেস্তে দিচ্ছে।
