নিজস্ব প্রতিনিধি : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে টানা কয়েকদিনের অতিভারী বর্ষণ এবং সাগরের জোয়ারের পানিতে ভাসছে পুরো চট্টগ্রাম নগরী। আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীতে রেকর্ড ৩৩০ দশমিক ৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নজিরবিহীন এই অতিবৃষ্টিতে বন্দরনগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গিয়ে ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে চরম ভোগান্তির পাশাপাশি থমকে গেছে স্বাভাবিক নাগরিক জীবন।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানিয়েছেন, নিম্নচাপের প্রভাবে এই অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে এবং এই বৃষ্টিপাত আগামী আরও অন্তত পাঁচ দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানির যৌথ থাবায় শহরের বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, ওয়াসা মোড়, হালিশহর, পতেঙ্গা, চান্দগাঁও, বাকলিয়া ও চকবাজার এলাকা পুরোপুরি জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এর ওপর দুপুরের দিকে জোয়ারের পানি আগ্রাবাদ, কাট্টলী, বন্দরটিলা, গোসাইডাঙ্গা, চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের মতো প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা জাহিদ ইসলাম ও বহদ্দারহাটের চাকরিজীবী হেফাজুতুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সামান্য বৃষ্টিতেই বাসার নিচতলায় পানি জমে যায়। অফিস যাওয়ার সময় কোনো রিকশা পাওয়া যায় না, আর পাওয়া গেলেও দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া হাঁকা হচ্ছে। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়া যেন এখন ভাগ্যের ব্যাপার।”
বহির্নোঙরে পণ্য খালাস স্থগিত, ২ ফ্লাইট ঢাকায় ডাইভার্ট : ভারী বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগর অত্যন্ত উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে (আউটার অ্যাঙ্করেজ) বড় আকারের জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামা ও খালাস কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) সচিব রেফায়েত হামিম জানান, বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি থাকায় বহির্নোঙরে থাকা ৪৩টি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বন্দরের ভেতরের টার্মিনালগুলোতে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজ স্বাভাবিক রয়েছে। অন্যদিকে, রানওয়েতে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে না পেরে অভ্যন্তরীণ রুটের দুটি যাত্রীবাহী ফ্লাইটকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ডাইভার্ট (ঘুরিয়ে দেওয়া) করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ।
পাহাড়ধসের শঙ্কা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ : টানা বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা তীব্র হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া জানান, “আমরা ইতিমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল থেকে ৩০টি পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছি। নগরীর ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী প্রায় ৬ হাজার ৫৫৫ জন মানুষকে অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।” যেকোনো ধরনের প্রাণহানি এড়াতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপদ্রুত এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে এবং আশ্রয় নেওয়া মানুষদের শুকনো খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।
চসিকের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে তীব্র বিতর্ক : এদিকে, সোমবার চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ও প্রধান প্রকৌশলীকে নিয়ে নগরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে যান চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেন। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত মনিটরিং এবং সব সেবা সংস্থাকে নিয়ে গঠিত শক্তিশালী কমিটির কারণে দুই দিনের টানা বৃষ্টিতেও চট্টগ্রাম মহানগরীতে কোনো উল্লেখযোগ্য জলাবদ্ধতা হয়নি।” একই দিন চসিকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও মেয়রের এই দাবির স্বপক্ষে পোস্ট দেওয়া হয়।
বাস্তব পরিস্থিতির সাথে মেয়রের এই দাবির কোনো মিল না থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চসিকের ওই পোস্ট ঘিরে তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছেন নেটিজেনরা। মো. কামরুল হাসান বাপ্পা নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী চসিকের পোস্টে মন্তব্য করেন, “৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম নিমতলা, দুইতলা মসজিদ ও আব্দুল লতিফ রোডের খালটা একটু ভিজিট করে যাওয়ার নিমন্ত্রণ রইল।” মোহাম্মদ রাফি নামে আরেকজন ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছেন, “খালের কাজ সম্পূর্ণ না হওয়ায় কাজীরহাট ও কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় পানি উঠেছে। এখনও পানির মধ্যে বসে এই মন্তব্য করছি। দয়া করে খালের কাজ দ্রুত শেষ করুন।” নগরবাসীর স্পষ্ট অভিযোগ, প্রতি বছর জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও বর্ষা আসলেই একই দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয় তাঁদের।
