নিজস্ব প্রতিনিধি : দিনাজপুরে এক কৃষককে অপহরণ করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির চাঞ্চল্যকর অভিযোগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুব শাখা ‘জাতীয় যুব নাগরিক শক্তি’র পাঁচ শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার (৬ জুলাই) সন্ধ্যায় দিনাজপুর শহরের ঐতিহাসিক গোর-এ শহীদ ময়দান এলাকা থেকে একটি সাদা প্রাইভেটকারসহ তাদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে তাদের কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হলে বিজ্ঞ বিচারক আসামিদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— জাতীয় যুব নাগরিক শক্তির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আরিফ মুন (২৯), হাসিন ইশরাক মিম (২২), আজমির হোসেন (২২), সাজিদুল মিনহাজ (২৬) ও হৃদয় হোসেন (২২)। তারা সবাই এনসিপির স্থানীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ের সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুর সদর উপজেলার ২ নম্বর সুন্দরবন ইউনিয়নের খোশালপুর পুকুরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ভুক্তভোগী কৃষক আব্দুস সামাদ (৫৯) গত ৫ জুলাই রাতে পল্লী বিদ্যুৎ পাঁচ মাইল এলাকায় তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রেনু বেগমের বাড়িতে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, গভীর রাতে অভিযুক্ত এনসিপি নেতারা ও তাদের সহযোগীরা ওই বাড়িতে অতর্কিত চড়াও হয়। সেখানে আব্দুস সামাদ ও তার নাতি রিফাত ইসলামকে ব্যাপক মারধর করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের পর, তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোনসহ আব্দুস সামাদকে জোরপূর্বক একটি সাদা প্রাইভেটকারে তুলে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, পরদিন ৬ জুলাই দুপুরে অপহৃত আব্দুস সামাদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন থেকেই তাঁর ছেলে মো. মামুনের কাছে কল দেয় অপহরণকারীরা। তারা মো. মামুনের কাছে নগদ ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং সেই টাকা শহরের গোর-এ শহীদ ময়দান এলাকায় পৌঁছে দিতে বলে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে তার বাবাকে হত্যা বা কেটে টুকরো টুকরো করার হুমকি দেওয়া হয়।
ছেলের কাছ থেকে এই তথ্য পাওয়ার পরপরই কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি চৌকস দল গোর-এ শহীদ ময়দান এলাকায় বিশেষ ফাঁদ পাতে। টাকা লেনদেনের সময় পুলিশ চারদিক থেকে ঘেরাও করে অপহৃত কৃষক আব্দুস সামাদকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে অপহরণে ব্যবহৃত প্রাইভেট কারসহ ওই পাঁচ যুব নেতাকে আটক করা হয়। উদ্ধার করা হয় অপহৃতের মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোনও।
এই ঘটনায় অপহৃতের ছেলে মো. মামুন বাদী হয়ে দিনাজপুর কোতোয়ালি থানায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১০ থেকে ১২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি অপহরণ ও চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেন। এদিকে গ্রেপ্তারের পর কোতোয়ালি থানা চত্বরে ব্যাপক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা দলবল নিয়ে থানায় গিয়ে আটক নেতাদের জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পরবর্তীতে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও থানার সামনে অবস্থান নেন। এ সময় থানা চত্বরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গেও এনসিপির কিছু নেতাকর্মীর বাগ্বিতণ্ডা ও অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে।
দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নুরুন্নবী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “বাদীর সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অপহরণ ও চাঁদাবাজির নিয়মিত মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। গ্রেপ্তার পাঁচ আসামিকে আজ মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।” মামলার তদন্তের স্বার্থে এবং ঘটনার সাথে জড়িত বাকি পলাতক অজ্ঞাতনামা আসামিদের গ্রেপ্তারে জেলাজুড়ে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
