নিজস্ব প্রতিনিধি : জুলাই আন্দোলনে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত ৬ জনকে নৃশংস হত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুতর মামলায় জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ঐতিহাসিক এই রায় ঘোষণার পর আদালত কক্ষ থেকে বের হয়ে প্রিজন ভ্যানে ওঠার মুহূর্তে এক নতুন মেগা রাজনৈতিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন এই প্রবীণ বাম নেতা। উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মী ও উৎসুক জনতার উদ্দেশ্যে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও মারমুখী কণ্ঠে নিজের রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঙ্কার ছাড়েন।
আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক হাসানুল হক ইনু বলেন, “পাকিস্তান ভেঙেছি, স্বাধীনতা এনেছি; সেই কারণে আমাকে সাজা দেওয়া হলো।” রণাঙ্গনের এক সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধার মুখ থেকে এমন মরণজয়ী ও তীব্র রাজনৈতিক ওলট-পালট করা দাবি প্রকাশ পাওয়ার পর পুরো দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে এক নজিরবিহীন তোলপাড় ও মেগা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কোনো হেভিওয়েট বাম নেতার বিরুদ্ধে আসা এটিই প্রথম কোনো বড় আইনি ধাক্কা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে ১, ২, ৪, ৫ এবং ৮ নম্বর অভিযোগে বিজ্ঞ আদালত তাঁকে সম্পূর্ণ খালাস দিয়েছেন। তবে বাকি তিনটি গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে এই ১০ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। একাত্তরের পাকিস্তান ভাঙার কারিগর ও স্বাধীনতার অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টাকে এভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সাজা দেওয়াকে দেশের সচেতন সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের মনস্তাত্ত্বিক বিজয় হিসেবে দেখছেন।
জাসদ নেতার এই সাজা এবং ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে তাঁর এই ঐতিহাসিক আর্তনাদকে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ ও সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা অত্যন্ত মিশ্র ও সংবেদনশীল চোখে দেখছেন। এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল হক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনের এই অন্তিম সময়ে এমন নির্মম অবস্থা কোনোভাবেই প্রত্যাশা করা যায় না। তিনি আরও বলেন, ইনু ভাই একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ এবং প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তিনি কীভাবে এই বয়সে কুষ্টিয়ায় গিয়ে লোক হত্যা করতে পারেন তা কারও বোধগম্য নয়।
অন্যদিকে বিপরীত মেরুতে থাকা জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালের এই ঐতিহাসিক রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, অতীতে কেউ বড় মুক্তিযোদ্ধা বা সংগঠক থাকলেও ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে সাধারণ জনগণের ওপর বুলেটের নির্দেশ দিলে আইনের হাত থেকে তাঁর কোনো রেহাই নেই। আইনি মারপ্যাঁচে অপরাধ প্রমাণ করার চেষ্টা করা হলেও, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে এই বয়সে কাস্টডিতে পাঠানো দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য এক বড় ক্ষত হয়ে থাকবে বলে খোদ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতার এমন নাটকীয় কারাদণ্ড এবং আদালত প্রাঙ্গণে দেওয়া তাঁর এই বিস্ফোরক জবানবন্দি দেশের পরিমণ্ডলকে এক নতুন মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাসানুল হক ইনুর এই ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় এবং উচ্চ আদালতে তাঁর আইনজীবীদের পরবর্তী আপিল আবেদনের প্রতিমুহূর্তের খবরাখবর প্রবাসে থাকা সচেতন বাংলাদেশিরাও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এই রায় কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
