বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাস ও পেশাগত সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতার প্রশ্নে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর বিতর্ক সামনে এসেছে। দেশের সর্বোচ্চ প্রচারিত বাংলা দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে’র সাথে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এক বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তিনি সরাসরি স্বীকার করেছেন যে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পক্ষে তাঁর পত্রিকা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছে।
মতিউর রহমান সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে তাঁদের পত্রিকার অবস্থান ছিল দৃঢ়ভাবে পরিবর্তনের পক্ষে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পক্ষে তাঁরা অত্যন্ত পরিষ্কার ও স্বচ্ছ ভূমিকা পালন করেছিলেন, যা সে সময়ে খুব কম সংবাদপত্রই করতে পেরেছিল। সেই দিনগুলোতে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময়েও প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণ পায়ে হেঁটে কিনে পড়ার কথা ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা নিজেরাও পরে স্বীকার করেছেন।
এই সাহসী ও সক্রিয় ভূমিকার পেছনে দীর্ঘ ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ইতিহাস তুলে ধরেন প্রথম আলো সম্পাদক। তিনি শেখ হাসিনার সরকারকে সরাসরি “স্বৈরাচারী” আখ্যা দিয়ে বলেন, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে তাঁদের পত্রিকা চরম ভয়, চাপ এবং নানাবিধ বাধার মুখে কাজ করেছে। সরকারি অলিখিত নির্দেশে গ্রামীণফোন দীর্ঘ ১২ বছর প্রথম আলোতে কোনো বিজ্ঞাপন দিতে পারেনি এবং ইউনিলিভারসহ প্রায় ৫০টি বড় বড় কোম্পানিকে বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি সম্পাদক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
তবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, যে জুলাই আন্দোলনে প্রথম আলো সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সমর্থনের কথা জানালো, সেই জুলাই-পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের অংশীজনদের কাছ থেকেই প্রথম আঘাত আসে এই সংবাদমাধ্যমের ওপর। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের চরম উদাসীনতা ও জবাবদিহিহীনতার সুযোগে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো মূলধারার সংবাদপত্রের অফিসে মব হামলা ও উগ্রপন্থীদের তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করতে হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে পুঁজি করে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে পরিকল্পিতভাবে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
এই বর্বরোচিত হামলার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে উসকানিমূলক পোস্ট ছড়িয়ে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে “ভারতীয় দালাল” আখ্যা দিয়ে সরাসরি সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ঘটনার পর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস দুই সম্পাদকের প্রতি সমবেদনা জানালেও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর অভিযোগ করেন যে, সরকারের কোনো না কোনো অংশ এই ন্যক্কারজনক হামলা ঘটতে দিয়েছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন এই মব সংস্কৃতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি তুললেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর আইনি পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি।
মতিউর রহমানের এই ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি বর্তমানে নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকতা-বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এক গুরুতর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রথম আলো দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের “স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষ” সংবাদপত্র হিসেবে দাবি করে আসলেও সম্পাদকের এই বক্তব্য সেই নিরপেক্ষতার নীতির সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বেরই অংশ, তাই একে প্রচলিত অর্থে নিরপেক্ষতার লঙ্ঘন বলা ভুল হবে।
