নিজস্ব প্রতিনিধি : বরিশাল সিটি কলেজে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং ‘মব’ সৃষ্টি করে পরপর দুইবার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ দখলের মাধ্যমে পুরো কলেজ জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে শুরু হওয়া এই ক্ষমতার রদবদলে কলেজের সাধারণ শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর এক পরিকল্পিত ‘মব’ সৃষ্টি করে কলেজের तत्कालीन ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও বিএনপি অনুসারী শিক্ষক হাওলাদার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তৎকালীন সময়ে কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও মহানগর খেলাফত মজলিসের সহসভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন এবং জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল জব্বার কয়েকজন শিক্ষককে সাথে নিয়ে শাহাবুদ্দিনের কক্ষে ঢুকে আগে থেকে লিখে আনা পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করার জন্য নির্যাতন চালান।
সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন ওই দিনটিকে তাঁর জীবনের একটি ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করে জানান, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে রাজি না হলেও তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। ওই সময় কলেজের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ থাকায় তিনি এর কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করতে পারেননি।
শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর খেলাফত মজলিস নেতা মোয়াজ্জেম হোসেনকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার নিশ্চয়তা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বঞ্চিত করা হয়। জামায়াত নেতাদের কৌশলী মবের মাধ্যমে তৎকালীন সময়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের আসনে বসানো হয় জেলা জামায়াতের সাবেক আমির ও মহানগর কর্মপরিষদ সুরা সদস্য মো. হাবিবুর রহমানকে।
একই প্রক্রিয়ায় কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় সরকারি চাখার কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও জামায়াতে ইসলামীর রুকন অধ্যাপক মো. আব্দুর রবকে। এর পর থেকেই মূলত পুরো কলেজের প্রশাসনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে জামায়াত নেতাদের হাতে চলে যায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা হাবিবুর রহমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে অবসরে গেলে পুনরায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। এবার জ্যেষ্ঠতার তালিকায় প্রথম স্থানে থাকা ইসলাম শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেনকে টপকিয়ে এবং অন্য তিন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে উপেক্ষা করে আগের মতোই মব সৃষ্টি করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল জব্বার, যিনি জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ছিলেন চতুর্থ স্থানে।
এই অনিয়মের বিরুদ্ধে খেলাফত মজলিস নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন আদালতে একটি মামলা দায়ের করলে আদালত কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন এবং কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন। তবে আদালতের আদেশ অমান্য করে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুর রব ও নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ আব্দুল জব্বার মিলে মোয়াজ্জেম হোসেনকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেন।
পরবর্তীতে মামলা তুলে নেওয়ার শর্তে গত ৬ তারিখ তাঁর বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। ভুক্তভোগী শিক্ষক মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, পুরো কলেজ এখন জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় চাকরি বাঁচানোর স্বার্থে মামলা তুলে নেওয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের সাধারণ শিক্ষকেরা জানান, কলেজে বর্তমানে কর্মরত ৩৭ জন শিক্ষকের মধ্যে সভাপতি, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং মাত্র দুজন প্রভাষক জামায়াত অনুসারী। অথচ এই চারজন মিলে বাকি সব শিক্ষক-কর্মচারীকে সার্বক্ষণিক তটস্থ ও জিম্মি করে রেখেছেন এবং তাঁদের যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেই নতুন করে মব সৃষ্টির হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল জব্বার মব সৃষ্টির অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তাঁকে নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং মোয়াজ্জেম হোসেন জ্যেষ্ঠ হলেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তবে সাবেক অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিনকে নির্যাতন ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘যাঁরা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন কেবল তাঁরাই এই বিষয়ে বলতে পারবেন।’
