নিজস্ব প্রতিনিধি : দেশজুড়ে মহামারি আকার ধারণ করা হাম কেবল শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিই বাড়াচ্ছে না, বরং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে এক দুঃসহ অর্থনৈতিক বোঝা। একটি শিশু হাম ও পরবর্তী জটিলতায় আক্রান্ত হলে পুরো পরিবারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে লাখ লাখ টাকা ঋণের জালে জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অভিভাবকরা।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বুটিক কারিগর মোহাম্মদ নোমান তাঁর একমাত্র সন্তান আট মাস বয়সী জান্নাতকে বাঁচাতে সবটুকু সম্বল শেষ করেছেন। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে লাখ টাকার বেশি ঋণ করেও শেষ রক্ষা হয়নি; গত ১৩ মে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নিউমোনিয়ার জটিলতায় মারা যায় জান্নাত। সন্তানহারা নোমান এখন একদিকে তীব্র শোক, অন্যদিকে ঋণের জগদ্দল ভার বয়ে বেড়াচ্ছেন।
একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া শিশু তাসমিদের বাবা সামান্য বেতনের চাকরিজীবী মো. নয়ন সন্তানের যাতায়াত, ওষুধ ও পরীক্ষার খরচ মেটাতে গিয়ে ৪০ হাজার টাকা ঋণের দায়ে পড়েছেন। পটুয়াখালীর স্বপন খান তাঁর আট মাস বয়সী সন্তান রাফসানের চিকিৎসার জন্য কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন ৩৫ হাজার টাকা। বরিশাল থেকে আসা বেকার গাড়িচালক জুয়েল বেপারী জানান, একটি বেসরকারি হাসপাতালে মাত্র এক ঘণ্টা অবস্থান করতেই তাঁর ১৩ হাজার টাকা বিল আসে, পরে বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে সরকারি শিশু হাসপাতালের বারান্দায় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা খরচের এই আতঙ্কে অনেক দরিদ্র মানুষ অসুস্থ শিশুকে শুরুতে হাসপাতালে নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তাঁরা ভিটামাটি বা ঘটি-বাটি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়ে হাসপাতালের দিকে ছোটেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন জানান, উচ্চ স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে নিম্নবিত্তরা নিঃস্ব হয়ে যাওয়া দেশের গ্রামগুলোতে দারিদ্র্য বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবার জন্য প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালের সাধারণ শয্যায় হামের চিকিৎসা নিতে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার এবং জটিলতা থাকলে ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে এই ব্যয় ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা এবং পিআইসিইউ (PICU) প্রয়োজন হলে ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম জানান, শিশুরা এখন শুধু হাম নয়, নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্টের মতো ‘কমপ্লিকেটেড মিজলস’ নিয়ে আসছে, যার জন্য দীর্ঘ সময় আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হলেও জেলা পর্যায়ে আইসিইউ সংকটের কারণে ঢাকার ওপর চাপ বাড়ছে।
