অমিত হাসান অমি, জবি প্রতিনিধি: কে এই শহীদ জুয়েল? বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক শহীদ জুয়েল। তিনি ছিলেন অদ্ভুত ধরনের। অন্য সবার চেয়ে আলাদা এবং প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। যার রক্তে ছিল ক্রিকেট। ছিলেন ভীষণ একরোখাও। যে কথা একবার বলেছেন হাজার অনুরোধেও তা থেকে সরেননি।
শহীদ জুয়েল (পূর্ণ নাম: আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল) ছিলেন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অকুতোভয় গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা এবং জাতীয় পর্যায়ের স্বনামধন্য ক্রিকেটার। তিনি মুক্তিবাহিনীর দুর্ধর্ষ ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত হন।
১৯৭১ সালে ক্র্যাক প্লাটুনের এক দুঃসাহসিক অভিযানে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দিতে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হন কিংবদন্তি ক্রিকেটার ও গেরিলা যোদ্ধা শহীদ জুয়েল। গুলিতে তাঁর হাতের তিনটি আঙুল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হলে চিকিৎসক সেগুলো কেটে ফেলার পরামর্শ দেন।সেই যন্ত্রণার মুহূর্তেও দেশপ্রেম আর ক্রিকেটের প্রতি অদম্য ভালোবাসা থেকে জুয়েল চিকিৎসকের কাছে আকুতি জানিয়ে বলেছিলেন-
“আঙুল তিনটা রাইখেন স্যার, দেশ স্বাধীন হইলে ন্যাশনাল টিমের হইয়া ওপেনিংয়ে নামুম।”
ব্যক্তিগত স্বপ্নের চেয়ে দেশ স্বাধীন করাকেই বড় করে দেখেছিলেন এই বীর।
তবে তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-এ আজও নেই তাঁর নামে কোনো স্মারক, স্মরণী কিংবা দৃশ্যমান উদ্যোগ।
শহীদ জুয়েল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সরাসরি স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতেন। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ঢাকার একটি বাড়ি থেকে তাঁকে আটক করে। পরে তাঁকে নির্যাতন কেন্দ্রে নেওয়া হয়।
বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, আটক হওয়ার পর তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। ধারণা করা হয়, পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে হত্যা করে এবং তাঁর মরদেহও আর উদ্ধার করা যায়নি। সেই থেকেই তিনি “শহীদ জুয়েল” নামে পরিচিত।
স্বাধীনতার আগে জগন্নাথ কলেজের রসায়ন বিভাগে অধ্যয়নরত ছিলেন শহীদ জুয়েল। পাশাপাশি তিনি ঢাকার ফুটবলাঙ্গনে ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত মুখ। দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে শহীদ হন এই তরুণ ফুটবলার।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তিনি সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয়। তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজন ও আলোচনায় তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই শহীদ জুয়েলের নাম জানেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ, স্মারক কিংবা আনুষ্ঠানিক স্মরণ আয়োজনের মধ্যেও তাঁর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। ফলে স্বাধীনতার যুদ্ধে আত্মোৎসর্গ করা এই কৃতি শিক্ষার্থীর অবদান ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্থাপনা, গ্যালারি বা স্মারক শহীদ জুয়েলের নামে নামকরণ করা হলে তা শুধু একজন শহীদকে সম্মান জানানোই হবে না, বরং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় মনে রাখবে বিস্মৃত এক শহীদের নাম।
