যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে (এআরটি) বড় ধরনের একতরফা বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে যেখানে বাংলাদেশকে ১৩১টি শর্ত পালনের আইনি বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এমন বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে মাত্র ৬টি।
চুক্তির ভাষায় ইংরেজি ‘শ্যাল’ শব্দটি দিয়ে বাধ্যতামূলক বিষয় বোঝানো হয় এবং এই শব্দটির প্রয়োগ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশের জন্য তা অত্যন্ত কঠোর। বিপরীতে ‘উইল’ শব্দটি দিয়ে ইচ্ছাধীন বিষয় বোঝানো হয়, যা চুক্তিতে খুবই সীমিত আকারে ব্যবহার করা হয়েছে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটি নিয়ে বর্তমানে রাজনৈতিক দল ও অর্থনীতিবিদদের মাঝে তীব্র সমালোচনা চলছে এবং সংসদে এটি বাতিলের দাবিও উঠেছে।
চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো মার্কিন পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্কায়ন এবং কোটা সুবিধা প্রদান। বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে আমদানির ক্ষেত্রে কোনো অতিরিক্ত লাইসেন্স বা মান যাচাইয়ের নামে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করা হবে না।
মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত যেকোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে এবং তা যাতে মার্কিন পণ্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা না কমায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত কঠোর ভূমিকা পালনের শর্ত দেওয়া হয়েছে। অনলাইন ও সীমান্ত উভয় ক্ষেত্রেই কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক লঙ্ঘন ঠেকাতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে।
সেবা খাতের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুবিধা পায়, তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এছাড়া শ্রম আইনে শিশুশ্রম বা জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে তৈরি কোনো পণ্য আমদানি না করার অঙ্গীকার রয়েছে এই চুক্তিতে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজ দেশের শ্রমিক রক্ষায় কোনো সীমান্ত আইন করে বা রপ্তানিকারকদের কর ছাড় দেয়, বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করতে পারবে না। এমনকি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাতেও (ডব্লিউটিও) এই বিষয়ে কোনো অভিযোগ করা যাবে না বলে শর্ত দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর বৈষম্যমূলক কোনো কর আরোপ করা যাবে না। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নিরবচ্ছিন্ন ডেটা আদান-প্রদান নিশ্চিত করা এবং সাইবার নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কাজ করার শর্তও এতে অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সাথে চুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়, তবে তারা এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। চুক্তি বাতিল হলে আগের উচ্চ শুল্কহার পুনরায় কার্যকর করার ক্ষমতাও সংরক্ষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসায়িক শর্ত হিসেবে সোর্স কোড বা গোপন প্রযুক্তি দিতে বাধ্য করা যাবে না। তবে বিশেষ তদন্ত বা আদালতের প্রয়োজনে এসব তথ্য চাওয়া হলে তার কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
