আসিফ বিন আলী
বাংলাদেশ এখন সহিংস উগ্রবাদের এক নতুন ও জটিল ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে একদিকে যেমন উগ্রবাদ দমন করতে হবে, অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদের ভাষাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতাও বন্ধ করতে হবে।
জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ধর্মীয় উগ্রবাদকে অনেক সময় রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির জায়গা থেকে বিবেচনা করা হয়। এই হুমকিকে অস্বীকার করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে এর অপব্যবহার করাও রাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
সাম্প্রতিক সরকারি নথি অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ, শাহবাগ ও বিভিন্ন উপাসনালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এটিকে সাধারণ আইনশৃঙ্খলা সমস্যা না ভেবে সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখা জরুরি।
উদ্বেগজনক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একজন সদস্যসহ বেশ কয়েকজনকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি-র আস্তানায় শনাক্ত করা হয়েছে। যদি প্রশিক্ষিত বাহিনীর ভেতরে উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক প্রবেশ করে, তবে তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকাঠামোর জন্য ভয়াবহ হুমকি।
উগ্রবাদীরা এখন কেবল দুর্গম এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়; তারা ফেসবুক, ইউটিউব ও পডকাস্টের মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। তারা ধর্মীয় আবেগের ভাষায় রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার চালিয়ে ক্ষমতার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়, যা বিচারব্যবস্থা ও ভিন্নমতের জন্য হুমকিস্বরূপ।
গত ২০ মাসে আল-কায়েদা ও দায়েশপন্থী বিভিন্ন উগ্রবাদী বয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও প্রকাশ্য হয়েছে। তারা নিরাপত্তা বাহিনীকে ‘ইসলামের শত্রু’ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করছে এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সরাসরি অস্বীকার করছে।
বাংলাদেশের ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলা এবং ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে যে উগ্রবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি শহরের অভিজাত এলাকা ও ইংরেজি মাধ্যমে পড়া তরুণদেরও প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে উগ্রবাদ কেবল দেশীয় নয়, বরং একটি ‘ট্রান্সন্যাশনাল’ বা আন্তর্জাতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ থেকে তরুণরা বিদেশে গিয়ে টিটিপি-র মতো ভয়াবহ সন্ত্রাসী সংগঠনের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে নিহত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
টিটিপি জাতিসংঘ কর্তৃক আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট এবং গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স অনুযায়ী বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সংগঠন। এই সংগঠনের সাথে বাংলাদেশি নাগরিকদের যোগাযোগ তৈরি হওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি সরাসরি সতর্কবার্তা।
বাংলাদেশে ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটির রাজনৈতিক অপব্যবহার একটি বড় সংকট তৈরি করেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিলে প্রকৃত উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়ে যায় এবং জনমনে আস্থার সংকট দেখা দেয়。
কাউন্টার টেররিজমের বড় শক্তি হলো জনআস্থা, যা বর্তমানে সংকটাপন্ন। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর আস্থা না থাকলে সাধারণ মানুষ বা শিক্ষকরা উগ্রবাদের লক্ষণ দেখেও মুখ খুলতে ভয় পান, যা উগ্রবাদীদের বিকাশে সহায়তা করে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি তাদের সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি। গোপন আটক বা গুমের পরিবর্তে প্রতিটি গ্রেপ্তার ও অভিযোগ প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার নিশ্চিত করলে দীর্ঘমেয়াদী জনআস্থা তৈরি হবে।
বাংলাদেশকে এখন একসঙ্গে দুটি লড়াই করতে হবে: একটি সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে এবং অন্যটি কাউন্টার টেররিজমের রাজনৈতিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সন্ত্রাসী বানালে প্রকৃত সন্ত্রাসীরাই লাভবান হয়।
সন্ত্রাসবাদ দমন করতে হলে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা আর সহিংস উগ্রবাদকে আলাদা করতে হবে। রাষ্ট্র বিশ্বাসকে অপরাধীকরণ করতে পারে না, তবে যারা সহিংসতার প্রচার চালায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনের প্রয়োগ দরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, মাদ্রাসা ও গণমাধ্যমকেও এই লড়াইয়ের অংশ হতে হবে। শুধু রাষ্ট্রীয় অভিযান নয়, বরং সমাজকে বুঝতে হবে যে উগ্রবাদী বয়ান কোনো বিকল্প মত নয়, বরং তা নাগরিক স্বাধীনতার পরিপন্থী।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে জনআস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ পরিষ্কার সহিংস উগ্রবাদকে অস্বীকার করা বা রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো, উভয়ই রাষ্ট্রকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
