ড মাসুদার রহমান, অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হাম প্রাদুর্ভাব কেবল একটি জনস্বাস্থ্য সংকট নয়—এটি আমাদের নীতি-নির্ধারণ, দায়বদ্ধতা, বিশেষজ্ঞের মতামত উপেক্ষা এবং বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগের একটি কঠিন পরীক্ষা। শত শত শিশুর মৃত্যু এবং হাজারো সংক্রমণ আমাদের সামনে নির্মম প্রশ্ন তুলে ধরেছে: একটি সিদ্ধান্তের মূল্য কি এতটাই ভয়াবহ হতে পারে? এই ভয়াবহতার দায় কে নিবে? দায়ীরা কি জবাবদিহিতার আওতায় আসবে? এমন নানা প্রশ্ন!
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ UNICEF-এর মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করে আসছিল। এই ব্যবস্থার একটি বড় শক্তি ছিল এর নির্ভরযোগ্যতা—যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইকৃত সরবরাহ, সময়মতো ডেলিভারি এবং একটি সুসংহত কোল্ড-চেইন নিশ্চিত করা হতো। এই ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই দেশে হামসহ নানা প্রতিরোধযোগ্য রোগ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে ছিল।
কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন ইউনুস সরকার সেই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে অন্য উপায়ে টিকা ক্রয়ের নীতগত সিদ্ধান্ত নেন। যুক্তি যাই থাকুক না কেন, কাগজে-কলমে যুক্তিগুলো গ্রহণযোগ্য মনে হলেও, বাস্তবতা ভিন্ন প্রমাণিত হয়েছে।
টিকা কোনো সাধারণ পণ্য নয়; এটি একটি সময়-সংবেদনশীল এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা। উৎপাদন থেকে পরিবহন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নির্ভুলভাবে পরিচালিত না হলে পুরো কর্মসূচি ভেঙে পড়তে পারে। অন্য যে কোন প্রক্রিয়ায় টিকা ক্রয় সময়ক্ষেপণ, জটিলতা এবং সরবরাহ বিঘ্নের ঝুঁকি অনেক বেশি—যা বাস্তবেও ঘটেছে। টিকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে, এবং একটি বড় জনগোষ্ঠী—বিশেষ করে শিশুরা—অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে গেছে।
বিখ্যাত বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘সায়েন্স’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, UNICEF এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল। এমনকি তাদের একজন প্রতিনিধি অনুরোধ করেছিলেন—“For God’s sake… don’t do this।” এই সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হওয়াই আজকের সংকটের অন্যতম করুণ দিক। যখন বিশেষজ্ঞ মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তখন নীতিগত সিদ্ধান্তের মূল্য চুকাতে হয় সাধারণ মানুষকে—এক্ষেত্রে শিশুদের।
এমন প্রেক্ষাপটে জনমনে আরও একটি প্রশ্নও জোরালোভাবে উঠেছে—UNICEF কে পাশ কাটিয়ে অন্য প্রক্রিয়ায় টিকা ক্রয় কি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরির জন্য গ্রহণ করা হয়েছিল? এমন আশঙ্কা অনেকেই প্রকাশ করছেন যে, যদি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না থাকে, তবে বড় অংকের আর্থিক অনিয়ম বা পক্ষপাতিত্বের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অবশ্যই, এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে।
এর পাশাপাশি আরেকটি গভীর ও বেদনাদায়ক প্রশ্নও সামনে এসেছে—এই নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে যে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তার দায় কি সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ওপর বর্তায় না? বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে প্রধান উপদেষ্টা ড ইউনুস এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এর ওপর ? এটি যেমন একটি নীতিগত ব্যর্থতা, তেমনি ব্যক্তিগত দায়ও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই প্রয়োজন সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ। বিশেষজ্ঞের মতামতকে উপেক্ষা করে তাদের এই সিদ্ধান্তের কারনই আজ এত শিশুর প্রাণহানি, এত বাবা- মায়ের করুন আর্তনাদ !
এই সংকট আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রথমত, জনস্বাস্থ্য খাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রযুক্তিগত ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, একটি কার্যকর ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার আগে বিকল্প ব্যবস্থার সক্ষমতা ও ঝুঁকি গভীরভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় ভেঙে দেওয়া কখনোই হালকাভাবে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নয়।
সবচেয়ে বড় কথা—স্বাস্থ্যখাতে নীতিগত ভুলের মূল্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, তা মানবিক। একটি শিশুর জীবন কোনো পরীক্ষামূলক নীতির ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ হতে পারে না।
এটি কি শুধুই নীতির ভুল – নাকি এর সাথে অন্য কোন কিছু জড়িত যা বাক্তিকেন্ত্রিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এরোকোন নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল ? এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। কোথায় ভুল হয়েছে, কে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কেন সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জাতির সামনে আসা জরুরি। দায়ীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার পাশাপাশি, ভবিষ্যতে একই ভুল এড়ানোর জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য।
বাংলাদেশ অতীতে টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়িয়েছে। সেই সাফল্যকে ধরে রাখতে হলে আমাদের নীতি-নির্ধারণে আরও দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক এবং মানবিক হতে হবে। কারণ, শেষ পর্যন্ত প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত একটি বিষয় মানুষের জীবন।
