নিজস্ব প্রতিনিধি
রাজধানীর কোনো এক নির্জন কক্ষ কিংবা হাসপাতালের প্রিজন সেলে যখন ৮১ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ একাকী সময় কাটান, তখন তাঁর মাথার ওপর ঝুলে থাকা কয়েক দশকের আইনি ক্যারিয়ার বা একসময়ের সর্বোচ্চ আদালতের সেই দাপুটে আসনটি খুব একটা কাজে আসে না। তাঁর সামনে তখন কেবল দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা আর ২৮০ দিনের একটি ক্যালেন্ডার যেখানে প্রতিটি দিনই এক একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের এই দীর্ঘ কারাবাস আজ কেবল একজন ব্যক্তির আইনি লড়াই নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক করুণ আখ্যান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কল্পনা করুন, একটি মামলার দরজা খুলতেই অন্য একটি তালা আপনার সামনে এসে হাজির হচ্ছে। একেই আইনজ্ঞরা বলছেন “চেইন অ্যারেস্ট”। যখন আদালত থেকে জামিন পাওয়ার আনন্দটুকুও কারাফটকের বাইরে পৌঁছানোর আগেই নতুন আরেকটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এসে থামিয়ে দেয়, তখন সেই প্রক্রিয়াটিকে কেবল ‘আইন’ বলা কঠিন হয়ে পড়ে।
৮১ বছর বয়সী এই প্রবীণ মানুষটি হৃদরোগ আর ডায়াবেটিসের মতো জটিলতায় ভুগছেন। অথচ ফৌজিদারি কার্যবিধির ৪৯৭ (১) ধারায় যেখানে বয়স ও স্বাস্থ্যের কারণে জামিন পাওয়ার স্পষ্ট সুযোগ রয়েছে, সেখানে তিনি আজ ২৮০ দিন ধরে নিছক অভিযোগের ভারে বন্দি। বিচার শুরু হওয়ার আগেই যখন কাউকে ৯ মাস জেলে কাটাতে হয়, তখন সেই বন্দিত্ব কি কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া, নাকি এটি এক ধরণের ‘বিচার-পূর্ব শাস্তি’?
খায়রুল হকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মূলে রয়েছে তাঁর দেওয়া কিছু বিতর্কিত রায়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে অন্য জায়গায় একজন বিচারপতি তাঁর বিচারিক আসনে বসে যে সিদ্ধান্ত দেন, তার জন্য কি পরবর্তীতে তাঁকে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হতে হবে? যদি বিচারিক সিদ্ধান্তের জন্য হাতকড়া পরতে হয়, তবে আগামী দিনে কোনো বিচারক কি পারবেন সম্পূর্ণ নির্ভীক হয়ে রায় দিতে?
এটি কেবল খায়রুল হকের অধিকার নয়, বরং রাষ্ট্রের ‘বিচারিক স্বাধীনতা’র একটি বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিচারপতিদের যে সুরক্ষাকবচ দেওয়া হয়, তা যদি খসে পড়ে, তবে গোটা বিচার ব্যবস্থার মেরুদণ্ডই দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
ন্যায়বিচারের মূল কথা হলো বিচার হতে হবে দৃশ্যমান। একজন ব্যক্তি যিনি একসময় দেশের আইনকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর যদি আজ এমন অনিশ্চিত দশায় দিন কাটাতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাটা অমূলক নয়। ছা-পোষা সাধারণ নাগরিক তখন ভাবতে বাধ্য হন, “রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের মানুষেরই যদি এই দশা হয়, তবে আমাদের সুরক্ষা কোথায়?”
রাজনীতি আর আইন যখন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানবাধিকার। আইনের শাসন মানে কেবল মুখে বুলি আওড়ানো নয়, বরং অসুস্থ ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি ন্যূনতম মানবিকতা দেখানো এবং দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচারের মুখোমুখি করা।
২৮০ দিনের এই কারাবাস কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি নীরব চিৎকার। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই ন্যায়বিচার বঞ্চিত হওয়া। খায়রুল হক অপরাধী কি নির্দোষ, তা আদালত ঠিক করবে। কিন্তু বিচার শুরুর আগেই একজন প্রবীণ মানুষকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।
শৃঙ্খল ভাঙার দায়িত্ব আজ আইনেরই; কারণ আইন যদি কেবল আটকানোর হাতিয়ার হয়, তবে মুক্তির পথ খুঁজবে কে?
