নিজস্ব প্রতিনিধি :
রাজধানীর গণপরিবহনে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়ায় চলছে চরম নৈরাজ্য। পান্থপথের বসুন্ধরা সিটি থেকে বনানী ১১ নম্বর পর্যন্ত মাত্র সাত কিলোমিটার পথ যেতে এক চালক ভাড়া হাঁকিয়েছেন ৫০০ টাকা। অথচ বিআরটিএ নির্ধারিত হিসেবে এই পথের ভাড়া হওয়ার কথা ছিল বড়জোর ১৩০ টাকা।
২০০৩ সালে যখন এই অটোরিকশা চালু হয়, তখন চালকরা সাধারণত মিটারে উঠে আসা ভাড়ার চেয়ে ২০ টাকা বেশি চাইতেন। কিন্তু গত দুই দশকে পরিস্থিতি বদলেছে ভয়াবহভাবে। এখন মিটার কেবল নামমাত্র শোভাবর্ধক যন্ত্র, ঢাকার রাজপথে চালকরা এখন ইচ্ছেমতো চুক্তিতে ভাড়া হাঁকিয়ে বসে থাকেন।
এই দীর্ঘ সময়ে দেশে একাধিক সরকারের পরিবর্তন ঘটলেও অটোরিকশা খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেনি কেউ। বিএনপি সরকারের সময় শুরু হওয়া এই অনিয়ম সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আওয়ামী লীগের তিনটি মেয়াদ এবং এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সমভাবে বজায় ছিল।
বর্তমানে অটোরিকশার মালিকের জন্য দৈনিক নির্ধারিত জমা ৯০০ টাকা হলেও চালকদের কাছ থেকে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। এই বাড়তি জমার বোঝা শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ঘাড়েই চাপছে, ফলে স্বল্প দূরত্বেও এখন ১৫০ থেকে ২০০ টাকার নিচে কোথাও যাওয়া যায় না।
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, মিটারের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে বিআরটিএ ও পুলিশ যখনই এই আইন প্রয়োগ করতে যায়, তখনই চালক ও মালিকপক্ষ একজোট হয়ে সড়ক অবরোধ করে জনভোগান্তি সৃষ্টি করে।
নৈরাজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে অটোরিকশার সংখ্যা সীমিত থাকার কারণে। ২০০৩ সালে এক লাখ মিশুক-বেবিট্যাক্সি তুলে দিয়ে মাত্র ২৭ হাজার অটোরিকশা নামানো হয়েছিল। চাহিদার তুলনায় জোগান কম হওয়ায় বর্তমানে নিবন্ধন হাতবদল করেই মালিকরা ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা অবৈধ আয় করছেন।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটোরিকশাকে কোনো বড় কোম্পানির অধীনে না এনে খুচরা মালিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়াই শৃঙ্খলাহীনতার মূল কারণ। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যুক্ত থাকায় এই চক্রটি কখনোই নিয়মের তোয়াক্কা করেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় কোনো কোম্পানির অধীনে শক্ত নীতিমালার আওতায় পর্যাপ্ত অটোরিকশা না নামালে বিদ্যমান ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা অসম্ভব। ২০১৮ সালের কঠোর আইন কেন আজ পর্যন্ত কার্যকর করা সম্ভব হলো না, সেই জবাবদিহি এখন বিআরটিএ ও পুলিশের কাছে সময়ের দাবি।
