নিজস্ব প্রতিনিধি
নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার মেঘনা নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল এখন আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানিতে প্রকম্পিত। আধিপত্য বিস্তার, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করতে সেখানে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০০ সদস্যের এক প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী বাহিনী।
স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নরসিংদী কারাগার থেকে লুণ্ঠিত হওয়া সরকারি অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখন এই বাহিনীর হাতে।
রায়পুরার ২৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮টি ইউনিয়নই মেঘনা নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল। এক সময় এই এলাকায় গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে টেঁটা ও দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার বেশি থাকলেও বর্তমানে তার জায়গা নিয়েছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাঁশগাড়ি, নিলক্ষা, মির্জার চর ও পলাশতলি ইউনিয়নের বেশ কিছু চিহ্নিত অপরাধী এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাহিনীর সদস্যদের শক্তির উৎস হিসেবে নরসিংদী ও পার্শ্ববর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নামও উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে ও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও তথ্যের ভিত্তিতে এই বাহিনীর বেশ কয়েকজন হোতার নাম বেরিয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম, বাঁশগাড়ির হারুন মিয়া, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রাতুল হাসান ও আশরাফুল হক, এরশাদ, আবু সায়েদ ও স্বপন মেম্বার। মির্জার চরের মো. নুরুল ইসলাম, ইমান আলী, দুলাল ও হাসান আলী। নিলক্ষার মো. হান্নান ওরফে হান্না।পলাশতলির আবিদ হাসান রুবেল।
এছাড়া আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের এক পোস্টে মিন্টু কমিশনার, আফজাল মেম্বার, ঘোড়া কামাল ও আজান চৌধুরীর মতো ব্যক্তিদেরও এই চক্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
চরাঞ্চলের এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে মেঘনা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন। জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর এলাকার শাহবাজপুর-বড়িকান্দির বালুমহালের ইজারা কেন্দ্র করে নরসিংদীর রায়পুরার চরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে। এমনকি গত ২৫ জানুয়ারি চরমধুয়া ইউনিয়নে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বাধীন দল সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণের মুখে পড়ে।
সন্ত্রাসীদের এই বেপরোয়া কার্যকলাপে গত এক বছরে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন। ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীনগর ইউনিয়নে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হয় ১৪ বছরের স্কুলছাত্র মুস্তাকিম মিয়া। এছাড়া কুয়েতপ্রবাসী মামুন মিয়া, মোমেনা বেগম এবং আমিন ও বাশারের মতো সাধারণ মানুষ এই অস্ত্রবাজির বলি হয়েছেন। বর্তমানে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আধিপত্য ধরে রাখতে এই বাহিনীগুলো পুনরায় অস্ত্রের মহড়া শুরু করেছে বলে স্থানীয়রা জানান।
অস্ত্রসহ ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোকে এআই (AI) দিয়ে তৈরি বা প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত ওবায়দুল্লাহ ও হারুন মিয়া। তবে পুলিশের কাছে এসব অভিযোগের গুরুত্ব অপরিসীম।
রায়পুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) প্রবীর ঘোষ জানান,
“মূলত বালুমহাল নিয়ে বিরোধের জেরেই এখানে অস্ত্রবাজি হয়। আমরা অসংখ্যবার অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করেছি। নতুন করে অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং আমরা অপরাধীদের দমনে আরো কঠোর অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
যৌথ বাহিনীর অভিযানে কিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও বাহিনীর মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। দ্রুত এই অপরাধী চক্রের মূলোৎপাটন না হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
