নিজস্ব প্রতিনিধি
ড. মুহাম্মদ ইউনূস—নোবেলজয়ী আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব এবং ‘থ্রি জিরো’র প্রবক্তা হিসেবে যাঁর বিশ্বজোড়া খ্যাতি। তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন শেষে তাঁর বিদায়বেলায় উঠছে গুরুতর সব অভিযোগ। সমালোচকদের মতে, তিনি সুকঠিন দেশ পরিচালনার চেয়ে ‘শ্রুতিমধুর বক্তৃতা’ ও ‘স্বপ্ন দেখানো’কেই প্রাধান্য দিয়েছেন। ফলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বদলে দেশ এক চরম বিশৃঙ্খল ও ভঙ্গুর অবস্থায় উপনীত হয়েছে।
ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক আমলারা এখন প্রকাশ্যেই তাঁর সমালোচনা করছেন। তাঁদের মতে, ড. ইউনূসসহ তাঁর সহকর্মী ‘তিন ডক্টরেট’ অর্থনীতিবিদ দেশের অর্থনীতিকে টেনে তোলার বদলে ডুবিয়েছেন। প্রধান প্রধান অভিযোগগুলো হলো, নীতি সুদহার ১০ শতাংশে পৌঁছানোয় গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার ১৪-১৬ শতাংশে ঠেকেছে। এতে নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ২.১১ লাখ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের জুনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৩০ লাখ কোটি টাকায় (১৫১% বৃদ্ধি)। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বৈদেশিক ঋণ পৌঁছেছে ১১৩.৫১ বিলিয়ন ডলারে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অন্তত ৩২৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং কাজ হারিয়েছেন প্রায় দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান এই সরকারকে ‘মাস্তান পার্টির’ সাথে তুলনা করে বলেন, এটি জাতিকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিয়েছে। সিনিয়র ব্যাংকার মামুন রশীদের মতে, ব্যবসায়ীদের সাথে কোনো সংলাপ না করে কেবল ছাত্রদের প্রাধান্য দিয়ে জাতির সাথে ‘প্রতারণা’ করা হয়েছে। এমনকি বিজিএমইএর নেতারা বারবার সাক্ষাতের সময় চেয়েও প্রধান উপদেষ্টার দেখা পাননি।
ড. ইউনূসের সময়ে জ্বালানির কোনো আপৎকালীন প্রস্তুতি না থাকায় বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে গ্রামে ১২-১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং এবং শহরেও তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট। জ্বালানি সংকটে সার কারখানা বন্ধ ও উৎপাদন ব্যাহত। সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র’র উৎপাদন বারবার পিছিয়ে দেওয়া।
ইউনূস সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত কিছু চুক্তি নিয়ে তীব্র জাতীয় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। পোশাক রপ্তানিতে সামান্য সুবিধার বিনিময়ে ২১.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতা। এছাড়া বাংলাদেশের বাজারে ৪,৪০০টি মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি। সমালোচকদের মতে, দেশের ‘লাইফলাইন’ খ্যাত এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ বিদেশের হাতে তুলে দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। আমেরিকার সেফটি স্ট্যান্ডার্ড মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং চীন বা রাশিয়ার সাথে কৌশলগত চুক্তিতে মার্কিন বাধার আশঙ্কা।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, ড. ইউনূসের সরকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করার চেয়ে ‘সংস্কারের দৌড়ঝাঁপ’ ও ‘ব্যবস্থা পরিষ্কার’ করার দিকে বেশি নজর দেওয়ায় নিয়মিত ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে। ১৮ মাসের এই শাসনামল শেষে দেশ আজ এক ভয়াবহ ঋণের বোঝা আর উৎপাদনহীনতার চক্রে আবদ্ধ, যার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
