নিজস্ব প্রতিনিধি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের গেস্টরুমে এক সময়কার ত্রাস, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী এবং বর্তমান তথাকথিত ‘শিবির’ পরিচয়ে হল সংসদের ভিপি আজিজুল হকের বিরুদ্ধে উঠেছে নির্মম নির্যাতনের ভয়াবহ অভিযোগ। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়া এই ‘সুযোগ সন্ধানী’ নেতার হাতে লাঞ্ছিত এক শিক্ষার্থীর আর্তনাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্ধকার এক অধ্যায়কে সামনে নিয়ে এসেছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী তালহার (ছদ্মনাম) বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই মাসে পরীক্ষার আগের রাতে পড়ার অপরাধে তাকে গেস্টরুমে ডেকে পাঠান আজিজুল হক (১৯-২০ সেশন, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট)। আজিজুলের অভিযোগ ছিল‘হলের ছাত্র হয়ে কেন হলের গেস্টরুমে না এসে পড়ার রুমে থাকা হলো?’ সেই রাতে আজিজুলের পৈশাচিক চপেটাঘাতে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন তালহা। ফলাফলস্বরূপ, এসএসসিতে ডাবল স্ট্যান্ড করা সেই মেধাবী শিক্ষার্থীর মিডটার্ম পরীক্ষা দেওয়া হয়নি, গুনতে হয়েছে জরিমানা। আজিজুলের সেই চড়ের রেশ আজও কানে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
নির্যাতনের মাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিয়ামকে সম্মান দেখিয়ে হাসিমুখে কথা বলার অপরাধে তালহাকে ‘সিঙ্গেল গেস্টরুম’ (একাকী নির্যাতন)-এর শিকার হতে হয়। আজিজুল হকের নেতৃত্বে ১৫-২০ জন সিনিয়র মিলে স্টাম্প দিয়ে বেধড়ক পেটানোর পর তালহাকে ১৫ দিনের জন্য হলছাড়া করা হয়। শেষমেশ জীবন বাঁচাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী এই শিক্ষার্থী আজিমপুরের একটি মেস রুমে ছোট সিটে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।
আজিজুল হকের রাজনৈতিক জীবনের খতিয়ান যেন এক উপন্যাসের খলনায়ককেও হার মানায়। ভুক্তভোগী ও হল সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, তার চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময় শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ। সূর্যসেন হলে উঠে নিজেকে ‘কট্টর ছাত্রলীগ’ প্রমাণ করতে জুনিয়রদের ওপর চরম স্টিমরোলার চালান। প্রথমে বরিশালের ‘জয় গ্রুপ’ এবং পরে উত্তরবঙ্গের ‘সাদ্দাম গ্রুপ’-এ ভিড়ে ক্ষমতার দাপট দেখান। ৫ আগস্টের পর ভোল পাল্টে হয়ে যান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘সমন্বয়ক’। পরে ‘বাগছাস’-এ পদ নিলেও কৌশলগত কারণে তা ত্যাগ করেন। এখন নিজের পুরনো খোলসে ফিরে ‘গুপ্ত শিবির’ হিসেবে হল সংসদের ভিপি পদে আসীন হয়েছেন।
রেজিমের পরিবর্তন হলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তালহার মতো শত শত সাধারণ শিক্ষার্থী এখনো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কারণ, সেই দিনের নির্যাতনকারী আজিজুলরাই আজ হলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। আগে যারা ছাত্রলীগের ব্যানারে গেস্টরুমে টর্চার করত, এখন তারাই টুপির আড়ালে বা পদের জোরে হলের সিট নিয়ন্ত্রণ করছে।
ডাকসু যখন ‘গেস্টরুম ও ফ্যাসিবাদী নির্যাতন’ শীর্ষক স্মৃতি লিখন প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে, তখন অনেক শিক্ষার্থীই একে ‘রাজনৈতিক চাল’ হিসেবে দেখছেন। তালহার মতে, এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মানে পুরনো সেই প্যানিক অ্যাটাক ও ট্রমাকে নতুন করে উসকে দেওয়া। বিশেষ করে যখন নির্যাতনকারীরাই হলের বড় পদে বসে থাকে, তখন এমন আয়োজন এক প্রকার পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।
ছাত্র সমাজের দাবি, কেবল নাম আর ব্যানার পরিবর্তন করলেই হবে না; আজিজুলের মতো যারা ছাত্রলীগের আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত গেস্টরুমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে স্থায়ী বহিষ্কার এবং আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো থেকে এই ‘বিভীষিকা’ কোনোদিনই কাটবে না।
