নিজস্ব প্রতিনিধি
খুলনায় ডিউটিরত অবস্থায় কনস্টেবল সম্রাট বিশ্বাসের নিজের রাইফেলের গুলিতে আত্মহনন কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের ‘বদলি ও পোস্টিং’ বাণিজ্যের এক ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি। সিসিটিভি ফুটেজে নিজ কপালে রাইফেল ঠেকিয়ে ট্রিগার চাপা সম্রাট মারা যাওয়ার আগে তার মাকে জানিয়েছিলেন—বদলি হতে দেড় লাখ টাকা লাগবে। এই বিপুল অর্থের দুশ্চিন্তাই কি কেড়ে নিল এক তরুণের প্রাণ?
সম্রাট বিশ্বাসের এই পরিণতির সমান্তরালে উঠে আসছে সরকারি চাকুরিজীবীদের অন্দরমহলের আরও এক অন্ধকার চিত্র। একজন বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) তার দীর্ঘ ৯ বছরের কর্মজীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, ঘুষ না দেওয়ায় তাকে তিনবার অন্যায়ভাবে বদলি করা হয়েছে। অসুস্থ মায়ের সেবা করার জন্য নিজ জেলায় পদায়নের অধিকার থাকলেও সিন্ডিকেটের কারণে তিনি তা পাচ্ছেন না।
ওই কর্মকর্তার অভিযোগ, ১৭ মাস ধরে তার বেতন-ভাতা আটকে রাখা হয়েছে শুধুমাত্র এজি অফিস ও ক্যাশ পিওনকে ঘুষ না দেওয়ার কারণে। বারবার হামলার শিকার হয়েও বিচার পাননি তিনি। সমাজ ও আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একঘরে থাকা এই কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, “সম্রাট তো বিয়ে করেছিলেন, আমি এই অত্যাচারে বিয়েটাও করতে পারিনি।”
সম্রাট বিশ্বাসের মৃত্যুর পর বরাবরের মতোই ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’ তকমা দিয়ে আসল কারণ আড়াল করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু একজন বিসিএস ক্যাডার যখন বলেন, “হামলার শিকার হয়ে এজাহার দিয়েও আমি বিচার পাচ্ছি না, সেখানে পুলিশের সর্বনিম্ন পদের একজনের কথা কে শুনবে?”, তখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রকট হয়ে ধরা দেয়।
পুলিশ বা শিক্ষা ক্যাডার—সবখানেই যদি পদায়ন ও ন্যায্য পাওনার জন্য ‘টাকা’ প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়ায়, তবে মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তারা কোথায় দাঁড়াবেন? সম্রাটের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পেছনের কারণগুলোর বিচার না হলে এমন ট্র্যাজেডি চলতেই থাকবে। মানুষের ধৈর্য আর কতক্ষণ কুলায়, যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে থাকা ‘অদৃশ্য শক্তি’ একজনের সংসার থেকে শুরু করে পেশাগত জীবন পর্যন্ত তছনছ করে দেয়?
সৎ থাকার মাশুল যদি হয় ১৭ মাসের বকেয়া বেতন আর সামাজিক বিচ্ছেদ, তবে এই ঘুণে ধরা সিস্টেমের সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
আপনার পরিস্থিতি সত্যিই অমানবিক। ১৭ মাস বেতন না পাওয়া একজন মানুষের জন্য কতটা যন্ত্রণার, তা বাইরে থেকে কল্পনা করা কঠিন। তবে আপনার রাইফেল নিয়ে করা চিন্তাটা কেবলই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হোক, পরিণতির নয়। আপনি বিসিএস ক্যাডার হিসেবে যে যুদ্ধটা লড়ছেন, সেটা হয়তো আরও অনেকের হয়ে লড়ছেন। নিজেকে হারিয়ে ফেললে এই লড়াইটাও হেরে যাবে। দয়া করে নিজের যত্ন নিন, কোনো বিশ্বস্ত আইনি পরামর্শদাতার সাথে এই বেতন আটকে থাকার বিষয়টি নিয়ে পুনরায় আলোচনা করুন। দিনশেষে লড়াইটা বেঁচে থাকার জন্যই।
